রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে এসেছিলেন মানবজাতি কে এক আল্লাহ তায়ালার দিকে আহবান করার জন্য।  রাসূল সা. মানব জাতিকে হেদায়েতের দিকে আহবান করার পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবন কিভাবে পরিচালনা করবে সেই পদ্ধতিও দেখিয়ে দিয়েছেন।

তার পরিপ্রেক্ষিতেই দেখিয়েছেন মানুষ অসুস্থ হলে কিংবা স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য কি ধরনের নিয়ম কানুন অনুসরণ করতে হবে। 

চিকিৎসা পদ্ধতি

অনেকে অসুস্থাকে অভিশাপ হিসেবে মনে করে, আসলে অসুস্থতা আখিরাতের সফলতা অর্জনের জন্য একটি পরীক্ষা বিশেষ। কেননা আল্লাহ মানুষকে ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, অসুস্থতা ও ফল ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করে।

এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমানের কাজ। আজকে আমরা ১৪০০ বছর আগে হযরত মুহাম্মদ সা: এর দেয়া চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো।

জ্বর হলে ঠান্ডা পানি

ঠান্ডা পানিকে রাসূল সা. একটি চমৎকার চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি জ্বর হলে মাথায় ঠান্ডা পানির পট্টি ব্যবহার করতেন।  রাসূল সা. বলেন,

জ্বর হল দোযখের তাপ, সুতরাং পানি দিয়ে ঠান্ডা করো। [১]

কঠিন আঘাতে লবণ-পানির চিকিৎসা

বিচ্ছু আর সাপের কামড়ের বিষ নামানোর জন্য রাসূল সা. লবণ ব্যবহার করতেন।  রাসূল সা. কখনো ঔষধ ব্যবহার ত্যাগ করেননি কিংবা ঔষধের উপর অত্যধিক নির্ভর করেনি।

বিষাক্ততা নিরাময়ের জন্য রাসূল সা. বিষাক্ত স্থানে লবণ-পানি মালিশ করতেন। আবার এর সাথে রাসূল সা. কোরআনের আয়াত পড়তেন। [২]

রক্তক্ষরণ বন্ধে ছাই ব্যবহার

ওহুদ যুদ্ধের সময় আঘাতে রাসূল সা. এর মাথার রক্তে তার মুখমণ্ডল ভরে যায়। আলী রা: তাঁর বর্মে করে পানি এনে দিলেন আর ফাতিমা রা: তাঁর মুখমণ্ডল ধুয়ে দিলেন। ফাতিমা রাঃ দেখলেন রক্ত প্রবাহ বেড়ে যাচ্ছে।

তখন তিনি খেজুর পাতার পাটি পোড়ালেন আর তার ছাই রাসূল সা. এর ক্ষতস্থানের উপর প্রলেপ দেন। এরপর রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়।[৩]

এই হাদিস দ্বারা খুব সহজেই ছাইয়ের উপকার অনুমেয় হয়।

শিঙ্গা লাগানো

শিঙ্গা লাগানো হলো একটি ছোট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দেহ হতে দূষিত রক্ত বের করে দেয়া। বর্তমান যুগে এই চিকিৎসা খুব একটা হয় না। কিছুদিন আগেও বেদের মেয়েরা শিঙ্গা লাগাতেন। তবে চীনে এই চিকিৎসা যৎসামান্য পরিবর্তন করে করা হয় যা আকুপাংচার নামে পরিচিত।[২]

রাসূল সা. বলেন তিনটি জিনিসের চিকিৎসা আছে মধু, শিঙ্গা লাগানো এবং আগুনের সেকা। তবে আমি আমার উম্মতকে আগুনের সেকা ব্যবহার করতে নিষেধ করেছি।[৪] 

রোগের জন্য অস্ত্রোপচার

আলী ইবনে আবি তালিব রা: বলেন জনৈক রোগীকে দেখতে যাওয়ার সময় আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। রুগি ব্যক্তির কোমর ফুলে যায়। লোকজন বলাবলি করছিল যে এর ভিতরে পুঁজ আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ফোঁড়ার উপর অস্ত্রোপচার করতে বলেন। আমি তাঁর উপস্থিতিতে সাথে সাথে ঐ লোকটির ফোঁড়ায় অস্ত্রোপচার করি।[৫]

বোঝা যায় আলী রা: ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের দক্ষ ছিলেন, তা না হলে তিনি তাৎক্ষনিক ভাবে এই অস্ত্র প্রচার করতেন না।

ঔষধ হিসাবে গরুর দুধ

আরবের লোকেরা দুটি জিনিস উটের দুধ আর খেজুর এর জন্য গর্ববোধ করে। এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা. কে বলতে শুনেছেন, “তোমাদের গরুর দুধ পান করতে হবে কারণ এর মধ্যে ঔষধি গুন আছে। দুধের তৈলাক্ত পদার্থের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে তবে এর মাংস রোগ সৃষ্টি কারক।” [৫]

দুধ খাদ্য আর পানীয়র বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। গরুর দুধ মহিষ, ভেড়া এবং ছাগলের দুধের চাইতে উত্তম ও সুষম পানীয়। এটা মহিষ, ছাগল এবং ভেড়া দুধের চেয়েও ভাল।

গরুর দুধ অনেক রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। চিকিৎসকগণ গরুর দুধকে রোগের স্বাস্থ্যহানির পর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য ঔষধ হিসাবে গ্রহণের জন্য ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকে।

দুধের বেশ কিছু উপকারিতা:

  • দুধ দাঁত ও হাড়ের গঠন মজবুত করে।
  • মানসিক চাপ ও নিদ্রাহীনতা দূর করে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
  • মাংসপেশি গঠনে সাহায্য করে।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
  • বুক জ্বালাপোড়া ও পাকস্থলী ঠান্ডা রাখে দুধ। [৬]

ঔষধ হিসাবে কালোজিরা

কালোজিরা কে সর্বরোগের ঔষধ বলা হয়। রাসূল সা. বলেন, “মৃত্যু ছাড়া সর্ব রোগের চিকিৎসা আছে কালোজিরাতে।” [৭]

তাই আশাকরি কালোজিরার গুরুত্ব নিয়ে আর কিছু বলতে হবে না। এছাড়া কালোজিরার বেশ কিছু উপকারিতা:

  • ত্বকের বিভিন্ন রোগ দূর করতে দারুণ উপকারী কালোজিরা।
  • মাথাব্যথা দূর করে কালোজিরা।
  • ওজন এবং রক্তচাপ সামলাতে সাহায্য করে কালোজিরা।
  • হাড়ের ব্যথা ও দাঁত শক্ত করে কালোজিরা।
  • স্মৃতিশক্তি ও অ্যাজমা দূর করে কালোজিরা।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
  • এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। [৮]

ঔষধ হিসাবে মধু

মধুকে স্বয়ং আল্লাহ তায়লা পবিত্র কুরআনে ঔষধ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন,

“তার (মৌমাছির) উদর হতে নির্গত হয় বিবিধ বর্ণের পানীয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য।” [৯]

মধু কেবল ঔষধ হিসাবে নয়, পানীয় হিসাবেও পান করা যায়। মধু পান এর মাধ্যমে চিকিৎসা একটি সুপরিচিত চিকিৎসা পদ্ধতি সকালে খালি পেটে মধু খেলে অনেক রোগ সেরে যায় । মধুর সাথে পানি মিশাতে হয় সারা রাত্রি নির্জীব ভাবে কাটানোর পর ক্ষুধা বৃদ্ধির জন্য মধু মিশ্রিত পানি পান করতে হয়।

রাসূল সা. সাধারণত সকাল বেলা খালি পেটে এর চিকিৎসা গ্রহণ করতেন। মধু ক্ষুধা বৃদ্ধি করে তিনি সকালের নাস্তা খেতেন। আসরের নামাজের পরে ওই রকম পান করতেন। 

চর্ম রোগে মধু ব্যবহার করতেন। তিনি পোড়া ও চর্ম রোগের স্থানে মধু মালিশ করে দিতেন।  রাসূল সা. নিয়মিত মধুপান করতেন আর মধুর প্রশংসা করতেন।

রাসূল সা. বলেন কোন ব্যক্তি মাসে তিন দিন সকালে মধু পান করলে তার গুরুতর কোন সমস্যা হবে না [১০]

মধুর বেশ কিছু উপকারিতা

  • রক্তচাপ দূর করে মধু।
  • দাঁতের ব্যথা দূর করে।
  • রূপচর্চা এবং যৌবন ফিরিয়ে আনতে মধুর উপকারিতা অনস্বীকার্য।
  • কাশি ও ঠান্ডা দূর করে মধু।
  • ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করে মধু।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য ও নিদ্রাহীনতা দূর করে মধু।[১১]

ঔষধ হিসাবে খেজুর

খেজুরের ব্যাপারে নতুন করে কিছু বলার নেই। প্রত্যেক মুসলমান খেজুরের উপকারিতা সম্পর্কে জানে। বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানও খেজুরের উপকারিতা স্বীকার করেছে। যাই হোক খেজুর সম্পর্কে রাসূল সা. কি বলেছেন সে সম্পর্কে জানা থাকা জরুরি। রাসূল সা: বলেন,

“যে ব্যক্তি দৈনিক সাতটি আযওয়া খেজুর খাবে সে সেদিন কোন বিষাক্ত রোগে কিংবা জাদুমন্ত্রে আক্রান্ত হবে না।” [১২]

অন্যত্র বলেন,

“আযওয়া বেহেশতি ফল, এতে বিষ জাতীয় রোগ আরোগ্য হয়।” [১৩]

খেজুরের বেশ কিছু উপকারিতা

  • খেজুর শক্তি বৃদ্ধি এবং দুর্বলতা দূর করে।
  • ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য এবং হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।
  • রুচি বৃদ্ধি ও রক্তস্বল্পতা দূর করে।
  • হৃদরোগ ও কলেস্টোরল থেকে মুক্তি দেয়।[১৪]

রাসূল সা. নিজে যেমন খেজুর খেতেন তেমনি তাঁর উম্মতকেও এর উপকারিতা বর্ণনা করেন।

শেষ কথা

উপরে উল্লেখিত পদ্ধতি ব্যতীত চিকিৎসার জন্য আরও অনেক পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। ১৪০০ বছর আগে রাসূল সা. চিকিৎসা যুগান্তকারী কিছু পদ্ধতি উম্মতকে দিয়ে দেন যা বর্তমান আধুনিক যুগের জন্য এক বিস্ময়কর বিষয়।

সূত্র:

১. সহিহ আল বুখারী ৭ম খন্ড হাদিস নং – ৬১৯

২. মহানবী সা: এর আদর্শ ও বিজ্ঞান – মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তালুকদার

৩. সহিহ আল বুখারী হাদিস নং – ৬১৮

৪.সহীহ বুখারী ৭ম খন্ড ৫৮৬, ৫৮৭

৫.যাদুল মা’আদ

৬. সমকাল ৩১ জুলাই ২০১৭

৭. সহিহ আল বুখারি হাদিস নং-৫৯২

৮. কালের কণ্ঠ অনলাইন ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

৯. সূরা নাহল:৬৯

১০. সহিহ তিরমিজি হাদিস নং – ৪৫৭০

১১. দৈনিক ইনকিলাব ৮ জুন, ২০১৬

১২. সহীহ আল বুখারী খন্ড ৭ হাদিস নং – ৩৫৬, ৬৬৩,৬৭১

১৩. সহীহ তিরমিযী হাদিস নং ৪২৩৫

১৪. বাংলাদেশ প্রতিদিন ১২ অক্টোবর, ২০১৭

 

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।