আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর কোন কিছু অযথা সৃষ্টি করেন নি। বরং প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে রহস্য বিদ্যমান। এসব রহস্যের অনেক কিছুই মানুষ জানে।

এছাড়া মানুষও কোন কিছু অনর্থক করে না। প্রতিটি কাজের পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য।

অজানাকে জানার আগ্রহ প্রত্যেক মানুষেরই আছে। এরকম অনেকের কাছে অজানা একটি বিষয় হলো ইসলামী মাসগুলো নামকরণ করার কারণ। আজকে আমরা ইসলামী মাসগুলো কি কারণে কিংবা কেন নামকরণ করা হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করবো।

মাসের নামকরণ

১.  মুহাররম

মুহাররম কে মুহাররমুল হারাম বলা হয়। এই নাম রাখা হয়েছিল জাহেলিয়াতের যুগে। মূলত সেই সময় এই মাসে সকল প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত করা হারাম তথা অবৈধ ছিল। আর এই কারণে একে মুহাররমুল হারাম রাখা হয়। [১]

২. সফর

সফর আরবি দ্বিতীয় মাস। ‘সিফর’ ধাতু থেকে সফর শব্দটি উৎপন্ন। সিফর শব্দের অর্থ শূন্য হওয়া। পূর্বে বলা হয়েছে জাহেলিয়াতের যুগে মুহাররম মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ হারাম ছিল। কিন্তু সফর মাসে আবার তারা চির চিনা রূপে ফিরে আসতো তথা

যুদ্ধ বিগ্রহ করা শুরু করতো। যেহেতু সফর মাসে যুদ্ধের জন্য বের হয়ে যেত এবং তাদের বাড়ী গুলো শূন্য হয়ে পড়ে থাকত। তাই এই মাসকে সফর নামকরণ করা হয়।

আরেকটি মত হলো, সফর শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে সুফর ধাতু হতে। সুফর অর্থ হলো হলদে বর্ণ। মানুষ যখন এই মাসের নামকরণ করার উদ্যোগ নেয়, তখন দেখা যায় এই সময় গাছের পাতা ঝরার ঋতু চলে আসে। আর পাতা ঝরার পূর্বে পাতার রং হলদে রং ধারণ করতো। তাই তখন এই মাসের নাম সফর রেখে দেয়া হয়।[১]

৩. রবিউল আওয়াল

সফর মাসে যেহেতু পাতা ঝরার ঋতু ছিল আর পাতা ঝরার ঋতুর পর আসে বসন্ত। রবিউল আওয়াল মাসের নাম রাখার উদ্যোগ যখন নেয়া হয় তখন হিসাব অনুযায়ী এই মাস ফসলে রবি অর্থাৎ বসন্তকালের শুরুতে পড়ে যায় তাই এই মাসের নামকরণ করা হয় ’রবিউল আওয়াল’। রবিউল আওয়ালকে প্রথম বসন্ত বলা যায়।[১]

৪. রবিউস সানি

রবিউস সানি কে রবিউল আখিরও বলা হয়। এই মাসের নামকরণ করার সময় দেখা গেল এটি বসন্ত কালের শেষ সময় তাই এর নাম রবিউল সানি রাখা হয়। রবিউস সানির অর্থ দ্বিতীয় বসন্ত।[১]

৫. জমাদিউল আউয়াল

জমাদিউল আউয়াল শব্দের অর্থ প্রথম শুকনো ভূমিখণ্ড। জমাদিউল আউয়ালকে জুমাদাল উলাও বলা হয়। জুমাদা শব্দটির উৎপত্তি জুমুদ ধাতু থেকে যার অর্থ হলো জমে যাওয়া, স্থবির হওয়া ইত্যাদি। আর উলা শব্দের অর্থ প্রথম। এই মাসের নামকরণের সময় শীত কাল থাকে আর শীত কালে সব কিছু স্থবির বা জমে যায় তাই একে জমাদিউল আউয়াল বলা হয়।

৬. জমাদিউস সানি

জমাদিউস সানি শব্দের অর্থ দ্বিতীয় শুকনো ভূমিখণ্ড। এটা আরবের গ্রীষ্মকালের শুরু বলা যেতে পারে এবং শীতের শেষ। আর শীতের সময় পানি যেমন একদম জমে যায় অপর দিকে গ্রীষ্মে যেমন পানি শুকিয়ে যায় আর তাই এই মাসকে জমাদিউস সানি বলা হয়।

৭. রজব

রজব শব্দটি তারজীব হতে উৎপত্তি। তারজীব শব্দের অর্থ সম্মান, শ্রদ্ধা করা। আরববাসীরা এই মাসকে আল্লাহর মাস বলত এবং এর সম্মান করত তাই এই মাসের নাম রজব রাখা হয়।[১]

রজব শব্দের অন্য আরেকটি অর্থ সরিয়ে রাখা। এই মাসে আরবে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল ফলে তারা বর্শার মাথা সরিয়ে রাখতো তাই এই মাসকে রজব মাস বলা হয়।

৮. শাবান

শাবান শব্দের উৎপত্তি শাব হতে। এর অর্থ বিক্ষিপ্ত, বের হওয়া, প্রকাশ হওয়া, বিদীর্ণ হওয়া। এই মাসে বিপুল কল্যাণ প্রকাশিত ও প্রসারিত হয়, মানুষের রিজিক বণ্টন হয় এবং তকদীরই ফয়সালা বণ্টন করা হয় তাই এর নাম শাবান রাখা হয়েছে।[১]

এছাড়া আর একটি মত হলো, আরবের লোকেরা এই মাসে পানির সন্ধানে আরবের চারদিকে ছড়িয়ে যেতো। যার ফলে এর নাম শাবান রাখা হয়।

৯. রমজান

রমজান শব্দের অর্থ দহন, জ্বালানো, পুড়ানো। এই মাসে মুমিনের গুনাহ সমূহ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়, তাই এর নাম রাখা হয়েছে রমজান। এছাড়া  রমজান মাসে নফসের কষ্ট ও জ্বলনের কারণ হয়, তাই এর নাম রাখা হয় রমজান। রমজান মাসে মুসলমান গন রোজা রাখার দ্বারা দুনিয়াবি লোভ লালসা থেকে দূরে থাকে। এই মাসে কুরআন নাজিল হয়েছিল।

১০. শাওয়াল

শাওয়াল শব্দের অর্থ উত্থিত। শাওয়াল শব্দটি শাওল ধাতু হতে নির্গত। শাওল অর্থ বাহিরে গমন করা। আরবের লোকেরা এই মাসে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে বের হতো। তাই এই মাসের নাম রাখা হয় শাওয়াল।[১]

আবার অনেকের মতে এই সময়ে স্ত্রী উট লেজ উত্থিত করে বাচ্চা প্রসব করতো যার কারণে এই মাসের নাম শাওয়াল রাখা হয়।

১১. জ্বিলকদ

জ্বিলকদ শব্দের অর্থ সাময়িক যুদ্ধ বিরতির মাস। জি অর্থ ওয়ালা আর কাদাহ অর্থ বসা। মাসটি আশহুরে হুরমের অর্থাৎ যে মাসগুলোকে বিশেষ সম্মান করা হয় সেই মাসগুলোর অন্তর্ভুক্ত তাই আহলে আরবগন এই মাসে যুদ্ধ বন্ধ করে বাড়িতে বসে থাকতো। এই কারণেই এই মাসের নাম জ্বিলকদ রাখা হয়।[১]

তবে এই মাসে আরবদের যুদ্ধ করা নিষিদ্ধ হলেও আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করার নিয়ম ছিল।

১২. জ্বিলহজ্জ

জ্বিলহজ্জ শব্দের অর্থ হজ্জের মাস। হাজ্জাহ হতে জ্বিলহজ্জ শব্দটি নেয়া। হাজ্জাহ অর্থ একবার হজ্জ করা। আবার এর মূল হিজ্জ হতেও নেয়া হতে পারে। কেননা হিজ্জ অর্থ বছর। যেহেতু  এই মাস বছরের একদম শেষে আসে এবং এর মাধ্যমে বছরের সমাপ্তি হয় তাই এই মাসের নামকরণ করা হয়েছে জ্বিলহজ্জ।[১]

আরবদের নিয়ম অনুযায়ী এই মাসেও যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। এছাড়া মুসলমানদের জন্য এই মাস গুরুত্বপূর্ণ এই মাসে হজ্জ করা হয় এবং ঈদুল আযহা পালন করা হয়।

শেষ কথা

আরবি মাস চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল। তাই আরবি মাসে শুরু বা সমাপ্তি হয় সূর্যাস্তের সাথে সাথে। অর্থাৎ চাঁদ দেখার সাথে সাথে। নতুন মাসের চাঁদ দেখা না গেলে ৩০ দিন পূর্ণ করতে হয়।

সূত্র:

১. গিয়াসাতুল লুগাত

 

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।