শবে বারাআত নিয়ে কম বেশী সবার মধ্যে বাড়াবাড়ি আর ছাড়াছাড়ির ভাব আছে। শবে বরাত নিয়ে অতিরঞ্জন নেহাত কম নয়। শবে বারাআত নাম পৃথিবীর সব জায়গায় এক নয় যেমন আরবি ভাষায় একে বলা হয় নিসফ্ শা’বান, ইরান এবং আফগানে নিম শা’বান, তুরস্কে বিরাত কান্দিলি এবং আমাদের উপমহাদেশে শবে বারাআত ।

শবে বারাআতকে কেন্দ্র করে আমাদের উপমহাদেশে অনেক বিদআত প্রচলিত। অপর দিকে এই বিদআতকে কেন্দ্র করে কিছু সম্প্রদায় শবে বারাআতকেই অস্বীকার করে। ফলে শবে বারাআতকে কেন্দ্র করে মুসলমান বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত। অথচ প্রত্যেক গ্রুপের মধ্যেই সঠিক এবং ভাল কিছু দিক বিদ্যমান।

শবে বারাআতে করণীয়

যাই হোক সকল মতভেদ ও মত পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এ রাতের মর্যাদা এবং করনীয় কী কী এই নিয়ে এই লেখায় আলোচনা করা হয়েছে। যেহেতু শবে বরাত নিয়ে বিস্তারিত লেখতে গেলে বড় আকারের পুস্তক হয়ে যাবে তাই এই লেখায় আমারা কেবল মূল আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ।

শবে বারাআত কি

শবে বারাআত যে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নাম তা ভূমিকাতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শবে বারাআতের শব শব্দটি ফার্সি ভাষার শব্দ, এর অর্থ হল রাত। অপরদিকে বারাআত আরবি শব্দ, এর অর্থ মুক্তি। শবে বারাআত সম্পর্কে কুরআনে কোন কিছু উল্লেখ নেই কুরআনে যা আছে তা হল লাইলাতুল কদর নিয়ে।

তবে শবে বারাআত নিয়ে অনেক হাদিস এসেছে। এসব হাদিসের মধ্যে সহীহ এবং যঈফ উভয় হাদিস রয়েছে। এবার আসুন হাদিস গুলোতে একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।

শায়েখ নাসিরুদ্দিন আলবানী রহঃ এর বিখ্যাত কিতাব “আস সিলসিলাতুস সাহিহাহ আল মুজাল্লাদাতুল কামিলাহ” এর ৩য় খন্ডের ১১৪৪ নং অধ্যায়ে ২১৮ নাম্বার পৃষ্ঠায় শবে বারাআত সম্পর্কে হাদিস এনেছেন এবং তিনি তার সিলসিলাতুস সাহিহাহর ৩য় খন্ডের ১৩৫ নং পৃষ্ঠায় বলেন।

“এই হাদিসটি সহীহ” এটি সাহাবিদের এক জামাত বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন সূত্রে যার একটি অন্যটিকে শক্তিশালী করেছে। তাদের মাঝে রয়েছেন, মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ, আবু সা’লাবা রাঃ, আব্দুল্লাহ বিন আমর রাঃ, আবু মুসা আশয়ারী রাঃ, আবু হুরায়রা রাঃ, আবু বকর সিদ্দীক রাঃ, আউফ বিন মালিক রাঃ, আয়েশা রাঃ প্রমুখ সাহাবাগণ। হাদিসটি হল:

হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন-অর্ধ শাবানের রাতে [শবে বারাআতে]আল্লাহ তায়ালা তাঁর সমস্ত মাখলুখের প্রতি মনযোগ আরোপ করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ব্যক্তি ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন।[১]

সুতরাং শবে বারাআতের অস্তিত্ব নাই এ ধরণের মূর্খতা এবং হাদিস বিরোধী কথা বলার কোন সুযোগ নেই। হযরত আয়শা রাঃ বলেন,

এক রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে না পেয়ে খুঁজতে বের হলাম। খুঁজতে খুঁজতে জান্নাতুল বাকীতে [মদিনার কবরস্থান] গিয়ে আমি তাঁকে দেখতে পেলাম। তিনি বললেন-কি ব্যাপার আয়শা? [তুমি যে তালাশে বের হলে?] তোমার কি মনে হয় আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অবিচার করবেন? [তোমার পাওনা রাতে অন্য কোন বিবির ঘরে গিয়ে রাত্রিযাপন করবেন?] হযরত আয়শা রাঃ বললেন- আমার ধারণা হয়েছিল আপনি অন্য কোন বিবির ঘরে গিয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন-যখন শাবান মাসের ১৫ই রাত আসে অর্থাৎ যখন শবে বরাত হয়, তখন আল্লাহ পাক এ রাতে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। তারপর বনু কালব গোত্রের বকরীর পশমের চেয়ে বেশী সংখ্যক বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন।[২]

শবে বারাআতে করণীয়

কবর যিয়ারত করা: শবে বারাআতে কবর যিয়ারতের ব্যাপারে হাদিস আসছে। তবে বর্তমানে আমরা যেই ঘটা করে কবর যিয়ারতে যাই এটা অপছন্দনীয়। একাকী কবর যিয়ারত করা উচিত।[৩]

নফল ইবাদাত: ইমাম বায়হাক্বী বলেন, আমাদেরকে বলেছেন আবু নস্র ইবনু কাতাদাহ্, তিনি আবু মানসুর মুহাম্মদ ইবনু আহমদ আযহারী থেকে, তিনি ইমরান

ইবনু ইদরীস থেকে, তিনি আবু উবায়দুল্লাহ থেকে, তিনি তাঁর চাচা ইবনু ওয়াহাব থেকে, তিনি মুয়াবিয়া ইবনু সালিহ থেকে, তিনি আলা ইবনুল হারিস

থেকে। তিনি বলেন, আয়শা (রা) বলেছেন:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা রাতে সালাত আদায় করছিলেন। তিনি সাজদায় যেয়ে দীর্ঘ সময় সাজদায় থাকলেন। এমনকি আমার মনে হল যে, তাঁর ওফাত হয়ে গেছে। আমি যখন এমনটি দেখলাম তখন শয়ন থেকে উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, ফলে তিনি নড়ে উঠলেন। তখন আমি (বিছানায়) ফিরে গেলাম। অতঃপর যখন তিনি সেজদা থেকে মস্তক উঠালেন এবং নামায শেষ করলেন তখন বললেন, হে আয়শা, তুমি কি মনে করেছিলে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার সাথে প্রতারণা করেছেন? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, আমি এমনটি মনে করিনি। বরং আপনার দীর্ঘ সিজদার কারণে আমার মনে হয়েছে যে, আপনার ওফাত হয়ে গেছে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি জান এটি কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্যক জ্ঞাত। তিনি বললেন, এটি মধ্য শাবানের রাত। আল্লাহ তা‘য়ালা এ রাতে বান্দাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। যারা ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদেরকে ক্ষমা করেন, যারা দয়া প্রার্থনা করে তাদেরকে দয়া করেন এবং যারা বিদ্বেষী তাদেরকে তাদের অবস্থাতেই রেখে দেন। [৩]

জিকির আযকার ও দোয়া করা: উসমান ইবনু আবিল আস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

যখন মধ্য-শাবানের রাত আগমন করে তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকে, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোন যাচনা কারী আছে কি? আমি তাকে দান করব। ব্যভিচারিণী ও শিরকে জড়িত ব্যতীত যত লোক যা কিছু চাইবে সকলকেই তাদের প্রার্থনা পূরণ করে দেয়া হবে। [৩]

রোযা রাখা: ১৫ই শাবানের দিবসে সিয়াম পালনের ফযিলতে কোনো নির্ভরযোগ্য হাদিস বর্ণিত হয় নি। তবে শাবান মাসে বেশি বেশি সিয়াম পালন, বিশেষত প্রথম থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত সিয়াম পালন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুপরিচিত সুন্নত। এ ছাড়া প্রত্যেক মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ সিয়াম পালনও সুন্নত নির্দেশিত গুরুত্বপূর্ণ মুসতাহাব ইবাদত। এজন্য সম্ভব হলে শাবানের প্রথম ১৫ দিন, না হলে অন্তত ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ সিয়াম পালন উচিত। [৩]

শবে বারাআতের বরকত লাভের পূর্বশর্ত:

  • এক আল্লাহতে বিশ্বাসী এবং সঠিক ঈমান
  • হিংসা বিদ্বেষ বর্জন
  • শিরক বর্জন
  • হালাল কামাই
  • সুন্নত অনুসরণ
  • উত্তম আখলাকের হওয়া
  • কাউকে হত্যা না করা
  • আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করা
  • মা-বাবার অবাধ্য না হওয়া
  • মদ সেবন না করা ইত্যাদি [৩, ৪]

শবে বারাআতে বর্জনীয়

হালুয়া-রুটির রুসুম পরিত্যাগ করা : শবে বারাআতকে কেন্দ্র করে হালুয়া রুটি খাওয়া, বিতরণ করা, তৈরি করা সব কিছু বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এরকম কাজ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে তাবে-তাবেঈ কেউ করে নি।

মসজিদ আলোকসজ্জা করা : শবে বারাআতকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে মসজিদ আলোকসজ্জা ও সাজানো হয় এটা অপচয় এবং বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। এধরণের কাজ দলিল দ্বারা এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন এমন কোন প্রমাণ নেই। এই দিনে এসব কাজ কর্ম সাধারণত শিয়ারা করে থাকে।

আতশবাজি, শোরগোল ও হৈ চৈ করা : মারাত্মক এবং গর্হিত একটি কাজ। এই কাজ প্রত্যেকের পরিহার করা উচিত। শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রাহ. বলেন এই রাতের নিকৃষ্টতম বিদআতসমূহের মাঝে নিচের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত-

ঘর-বাড়ি, দোকান-পাটে আলোকসজ্জা করা, খেলাধুলা ও আতশবাজির উদ্দেশ্যে সমবেত হওয়া ইত্যাদি। এগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এগুলোর সপক্ষে কোনো জাল রেওয়ায়েতও কোথাও নেই। প্রবল ধারণা যে, এগুলো হিন্দুদের ‘দেওয়ালী’ প্রথা থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।” [৫]

দলবদ্ধ হয়ে মসজিদে সালাত আদায় বা অনান্য ইবাদাত করা : শবে বারাআতের আমল হবে ব্যক্তিগত মসজিদে গিয়ে ইবাদাত বা নফল নামায পড়ার কোন নিয়ম পাওয়া যায় না। [৭]

শবে বরাত কেন্দ্রিক গোসল করা : শবে বারাআতে গোসল করা নিয়ে একটি বানোয়াট এবং সনদ বিহীন কথা প্রচলিত আছে যে গোসলের পানির বিনিময়ে ৭০০ রাকাত নফল নামাযের সওয়াব। এসব ফযিলত এবং কথা সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন।[৬]

শবে বরাত কেন্দ্রিক কোন বিশেষ নামায আদায়: শবে বারাআতকে নিয়ে অসংখ্য মিথ্যা এবং বানোয়াট ফযিলত এবং নামাযের পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এসব কথাবার্তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।[৬]

শবে বারাআতে ভাগ্য লিখা হয়: শবে বরাতে ভাগ্য লিখা হয় মর্মে রাসুল সা: ও সাহাবীগন থেকে বর্ণিত সকল হাদিস বানোয়াট, মিথ্যা ও দুর্বল।[৩]

শেষ কথাঃ 

শবে বারাআত নিয়ে ঝগড়া এবং ফেতনা ফ্যাসাদ কাম্য নয়। প্রত্যেকের উচিত সহনশীল হওয়া। কুরআন হাদিসকে আঁকড়ে ধরে ইসলামের মৌলিক বিষয় অনুসরণে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেয়। দেখা যায় শবে বারাআত নিয়ে আমাদের এতো বেশী বাড়াবাড়ি এবং ছাড়াছাড়ি করি পরে ঈমান নিয়ে টানাটানি হয়ে যায়।

 

সূত্র:

১. সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৬৬৫, মুসনাদুল বাজ্জার, হাদিস নং-২৭৫৪, মুসনাদে ইসহাক বিন রাহওয়াই, হাদিস নং-১৭০২, আল মুজামুল আওসাত, হাদিস নং-৬৭৭৬, আল মুজামুল কাবীর, হাদিস নং-২১৫, সুনানে ইবনে মাজা, হাদিস নং-১৩৯০, মুসনাদুশ শামীন, হাদিস নং-২০৩, মুসন্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদিস নং-৩০৪৭৯, শুয়াবুল ঈমান, হাদিস নং-৬২০৪

২. সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং-৭৩৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-২৬০২৮, মুসনাদে আব্দ বিন হুমাইদ, হাদিস নং-১৫০৯

৩. কুরআন-সন্নাহর আলোকে শবে-বরাত ফযিলত ও আমল: ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর

৪. শবে বরাত করণীয় ও বর্জণীয়: মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান খান

৫.মা সাবাতা বিস্সুন্নাহ ৩৫৩/৩৬৩

৬. মাসিক আলকাউসার

৭. ইক্‌তিযাউস সিরাতিল মুসতাকীম ২/৬৩১-৬৪১; মারাকিল ফালাহ ২১৯

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।