প্রত্যেক মুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য রমজানের এক মাস রোযা রাখা ফরয। কুরআনে বলা হয়েছে, সব জাতির জন্যই সিয়াম ছিল তবে একমাত্র মুসলমান জাতিই রমযান মাসে রোযা পালন করে থাকে। রোযা প্রকৃতপক্ষে উপবাস নয় বরং খাদ্য গ্রহণের সময়ের পরিবর্তন মাত্র।

রোযা রাখার স্বাস্থ্য উপকারিতা

অমুসলিম এবং কিছু দুর্বল মুসলমান রোযায় শরীরের ক্ষতি হয় বলে সন্দেহ করে। এই সন্দেহ দূর করার জন্য ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ গবেষণা চালিয়েছি আমার কয়েকজন সহযোগীর সাহায্যে । এই গবেষণার ভিত্তিতে দেশে বিদেশে অনেকগুলো গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছি। এই সমস্ত গবেষণায় সুস্থ শরীরে রোযার কোন ক্ষতি তো হয়ই না বরং কোন কোন ক্ষেত্র উপকার লক্ষ্য করা গেছে। বিস্তারিত নিচে উল্লেখ করা হবে।

তবে বলে রাখা ভাল রোযা রাখার ব্যাপারে বিজ্ঞান কি বলে কিংবা কি বলবে এটা কোন মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় বরং রোযা রাখা আল্লাহর হুকুম তাই এটা প্রত্যেক মুসলমানকে অনুসরণ করতে হবে এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিজ্ঞান নয় বরং তাওয়াককুল তথা আস্থা এবং ঈমান রাখতে হবে আল্লাহর উপর তিনি যা দিয়েছেন তা বান্দার ভালোর জন্য দিয়েছেন। যাই হোক নিচে রোযার শারীরিক উপকারিতা তুলে ধরা হয়েছে ইসলামের সৌন্দর্য এবং অমুসলিমকে বুঝানোর জন্য।

প্রথমত ভূমিকায় বলা গবেষণার কিছু তথ্য উপাত্ত এবং এর পাশাপাশি অনান্য গবেষণার তথ্য উপাত্ত তুলে ধরা যাক। সবগুলো গবেষণায় রোযা সম্পর্কে বেশ কিছু চমকপ্রদ বিষয় উঠে এসেছে যেমন:

১. সুস্থ রোযাদারদের মধ্যে কোন প্রকার ক্ষতির লক্ষণ পাওয়া যায়নি। রক্ত চাপ, BMR, ECG, Blood Biochemistry সহ সবরকম পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক পাওয়া গেছে। [১]

রোযা রক্তচাপ হ্রাসের অষুধহীন পদ্ধতি। ফলে রোযা এথেরোস্ক্লেরোসিসের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। রোযা গ্লুকোজ এবং পরবর্তীতে শরীরে থাকা ফ্যাট থেকে শক্তি উৎপাদন করতে ব্যবহৃত হয়। ম্যাটাবলিকের হার রোযার রাখার ফলে। অ্যাড্রেনালিন এবং নন-অ্যাড্রেনালিন মত হরমোন হ্রাস  পায়। এর ফলে ম্যাটবলিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। এছাড়া এর ফলে রক্তচাপও হ্রাস পায়। Seliger, S. & Haines, C.D. (2012) ‘Is Fasting Healthy?’

২. শতকরা প্রায় ৮০ জনের শরীরের ওজন কিছু কমেছে। এই ওজন: হ্রাসের পরিমাণ এক মাসে এক থেকে দশ পাউন্ড পর্যন্ত কিন্তু কোন রোযাদার এতে দুর্বলতার অভিযোগ করেননি। বরং বেশী ওজনের লোকদের অনেকে ওজন-হাসে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন । প্রায় ১২% রোযাদারের ওজন এক থেকে চার পাউন্ড পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাকি ৮% রোযাদারের ওজন স্থির থাকে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে শরীরের অতিরিক্ত ওজন হ্রাসের জন্য নানারূপ চিকিৎসা পদ্ধতি চালু রয়েছে যার সবকয়টিই কষ্টসাধ্য ও ব্যয় সাপেক্ষ রোযায় খুব ধীরে অল্প অল্প করে ওজন ত্রাস পায় তাই Obese রোগীরা নফল রোযার মাধ্যমে সহজেই ওজন হ্রাস করতে পারে।[৩]

৩. পাকস্থলির অন্নরসের উপর প্রভাব শতকরা প্রায় ৮০জন রোযাদারের বেলায় গ্যান্ত্রিক এসিড স্বাভাবিক পাওয়া গেছে। প্রায় ৩৬% অস্বাভাবিক এসিডিটি স্বাভাবিক হয়েছে যা এসিড বেশী বা কমা উভয় অবস্থায়ই দেখা গেছে। প্রায় ১২% রোযাদারের এসিড একটু বেড়েছে তবে কারো ক্ষতিকর পর্যায়ে যায়নি। সুতরাং রোযায় পেপটিক আলসার হতে পারে এমন ধারণা ভুল এবং মিথ্যা। তাছাড়া পেট খালি থাকলে অম্লরস হ্রাস পায় আর পেপটিক আলসারে অম্লরস বৃদ্ধি পায়।  [৪]

অবাক করা ব্যাপার হল ইসলাম এক্ষেত্রে অসাধারণ সমাধান দিয়েছে। কারো আলসার যদি ক্ষতিকর হয়ে থাকে এবং ক্ষুধা হলে ব্যথা বৃদ্ধি পায় তাহলে জোর করে রোযা রাখার প্রয়োজন নেই বরং পরে কাযা করে নিতে পারবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

যে অসুস্থ অথবা ভ্রমণকারী সে রোযা না রেখে পরে কাজা করে নেবে। [৫]

৪. রোযার সেহরি, তাড়াতাড়ি ইফতার করা এবং পেট ভরে খেয়ে দীর্ঘ তারাবিহের নামায সবই স্বাস্থ্য রক্ষামূলক।

৫. রোযার আরেকটি মজার ব্যাপার হল রোযা চন্দ্রমাস কেন্দ্রিক হওয়াতে রোযা বিভিন্ন ঋতুতে হয়ে থাকে। এর ফলে লম্ব এবং স্বল্প, শীত কিংবা গ্রীষ্ম সহ বিভিন্ন সময় রোযা রাখার সুযোগ হয়। এর ফলে দেহ এবং মনে বৈচিত্রতা কাজ করে।

৬. স্বাভাবিক ব্যক্তিদের রমজানের রোযার প্রথম কয়েক দিনে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা হ্রাস পায় এবং পরবর্তীতে ২0 তম দিন স্বাভাবিকীকরণের পরে গ্লুকোজ তুলনামূলক ভাবে সামান্য বৃদ্ধি পায়। আর এই বৈচিত্রতা স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় পরিসরের জন্য অনেক বেশী উপকারী।[৬]

৭. রমজান মাসে রোযা রাখার সময় ডায়াবেটিক রোগীদের উপর পর্যবেক্ষণ করে তাদের কোন পরিবর্তন বা শরীরের ওজনের সামান্য হ্রাস-বৃদ্ধিও দেখা দেয় নি। সম্ভবত রোযা রাখার কারণে ডায়াবেটিক রোগীরা খাদ্যের পরিমাণ এবং খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় অনুসরণের কারণে এ ফলাফল এসেছে।[৭]

অন্য গবেষণায়, HbA1c, সিরাম ফ্রাকটোসামাইন লেভেল, ইনসুলিন এবং সি-পেপটাইডের মাত্রা রমজানের সময় এবং রমজানের পরে খুব একটা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।[৮]

৮. রোযা পাকস্থলী ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে বিশ্রামে রাখে ফলে পরবর্তীতে খাদ্যের হজম শক্তি এবং ম্যাটাবলিজমকে স্বাভাবিক করে।[৯]

শেষ কথা

এই ছিল রোযার স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত লেখা। রোযার স্বাস্থ্য উপকারিতা আরও অনেক রয়েছে তবে এখানে কেবল রোযা নিয়ে স্বাস্থ্যের যেসব বিষয় নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ সেসব বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

 

সূত্র:

১. Muazzam, M. G. and Khaleque, KA (1959) :

Effects of Fasting in Ramadhan, J. Trop. Med. & Hyg.

London, 62 : 292-294

২. Khaleque, KA, Muazzam, MG and Ispahani. P.

(1960) : Further observation of the Effects of Fasting in

Ramadhan. J. Trop. Med. & Hyg. 63 : 241-243

৩. Muazzam, MG, and Ali, MN (1967) : Effects of Rama-

dan Fasting on Body Weight, The Medicus, Karachi, 34(5) :134-136

৪.Muazzam, MG, Ali, MN. and Husain, A. (1963)

Observations on the Effects of Ramadan Fasting on Gastric

Acidity, The Medicus. Karachi, 25 (5) : 228-233

৫. সূরা আল বাকারা: ১৮৫

৬. Davidson JC (1979) Muslims, Ramadan, and diabetes mellitus. Br Med J 2: 1511-1512.

৭. Azizi F, Siahkolah B (1998) Ramadan fasting and diabetes mellitus. Int J Ramadan Fasting Res 2: 8-17.

৮. Mafauzy M, Mohammed WB, Anum MY, Zulkifli A, Ruhani AH (1990) A study of the fasting diabetic patients during the month of Ramadan. Med J Malaysia 45: 14-17.

৯. Cott A (1977) “Fasting is a way of life”. New York, Banton Books.

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।