ইসলামী শারী‘য়াতে পবিত্রতা অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ কিছু কিছু বিষয় না জানার কারনে পবিত্রতা অর্জন ও তা রক্ষায় আমরা প্রতিনিয়ত ভুল করছি। তাই আজকে পবিত্রতা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ২০টি প্রশ্ন এবং সেই প্রশ্নের উত্তর আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরলাম।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছে “প্রসিদ্ধ ও বড় বড় ফিকহি বোর্ড”। উত্তরের পাশেই তার নাম উল্লেখ করা রয়েছে।

 

প্রশ্নঃ এক  ব্যক্তির অযু করার পর স্মরণ হয়েছে যে, তার পায়খানা অথবা প্রস্রাবের রাস্তা পবিত্র করতে হবে। অতঃপর সে উক্ত জায়গা পবিত্র করল । এখন কি তার পুনরায় নতুন অযু করতে হবে? না আগের অযুতেই যথেষ্ট হবে?

উত্তরঃ উত্তম হল নতুন করে অযু করে নেয়া। বিশেষ করে ইমাম সাহেবদের জন্য। তাহলে আইম্মায়ে কিরামের মতভেদ থেকে বেঁচে যেতে পারবে। -দুররে মুখতার : ১/১২৮

 

২। প্রশঃ অযু করার পর ছতর খুলে গেলে অযু ভেঙ্গে যায় কি?

উত্তরঃ অযু ভাঙ্গে না। কারণ, ছতর খুলে যাওয়া অযু ভঙ্গের কারণ নয়। এবং উলঙ্গ অবস্থায়ও অযু করা জায়েয আছে।

-ফাতাওয়া দারুল উলুম

 

৩। প্রশ্নঃ হুক্কা বা সিগারেট পান করলে অযু ভেঙ্গে যায় কি না?

উত্তরঃ অযু ভাঙ্গে না।  -ফাতাওয়া দারুল উলুম

 

৪। প্রশ্নঃ অযু করার মাঝামাঝি সময়ে অযু ভেঙ্গে গেলে আবার কি নতুন করে শুরু থেকে অযু করতে হবে?

উত্তরঃ পুনরায় শুরু থেকে অযু করতে হবে।  -দুররে মুখতার : ১/৫২৯।

 

৫। প্রশ্নঃ এক মহিলা নামায পড়ছে, এমতাবস্থায় তার বাচ্চা এসে দুধ পান করল, এখন সে মহিলার অযু এবং নামায ভেঙ্গে গেছে কি না?

উত্তরঃ অযু ভাঙ্গেনি। কারণ, দুধ পবিত্র জিনিস বের হয়েছে। আর পবিত্র জিনিস শরীর থেকে বের হলে অযু ভাঙ্গেনা কিন্তু সে মহিলার নামায ভেঙ্গে গেছে। কারণ, দুধ পান করানাে সাব্যস্ত হয়েছে।  -ফাতাওয়া দারুল উলূম: ১/১৪০। ৭

 

৬। প্রশ্নঃ শরীরে যে গােটা-পাঁচড়া, দাদ ইত্যাদি হয় এবং চুলকিয়ে চামড়া উঠালে তরল পদার্থ দেখা যায় এবং তা উঠা বসার সময় কাপড়ে লাগে, এতে কি অযু ভেঙ্গে যাবে? এবং কাপড় নাপাক হয়ে যাবে?

উত্তরঃ যে সমস্ত তরল পদার্থ যখমের স্থান থেকে বের হয়, কিন্তু প্রবাহিত হয়ে যায় না, তাতে অযু ভাঙ্গে না। এবং কাপড়ে লাগলেও কাপড় নাপাক হবে না। কিন্তু যদি যখমের স্থান অতিক্রম করে প্রবাহিত হয় অথবা একটু বের হলে মুছে ফেলে আবার বের হয়, আবার মুছে ফেলে, যদি না মুছা হত তবে প্রবাহিত হয়ে যেত, তাহলে অযু ভেঙ্গে যাবে। -ফাতাওয়া দারুল উলূমঃ ০ ১/ ১৪৯। ৮

 

৭। প্রশ্নঃ যে অযু দিয়ে জানাযার নামায পড়ছে সে অযু দিয়ে ওয়াক্তিয়া নামায বা অন্য কোন নামায পড়া জায়েয আছে কি না?

উত্তরঃ সে অযু যতক্ষন পর্যন্ত বাকী থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত যে কোন নামায পড়তে চায় পড়তে পারবে। কোন ক্ষতি নেই।

-ফাতাওয়া দারুল উলুম

 

৮। প্রশ্নঃ যদি কোন অযুদার ব্যক্তি কোন মহিলার দিকে খাহেশের নজরে তাকায়, তাহলে তার অযু ভেঙ্গে যাবে কি না?

উত্তরঃ যদি খাহেশের সাথে তার শরীর হতে কোন নাপাক যেমন মযী, অদি (প্রস্রাবের আগে পরে এবং সহবাসের পূর্বে যে হালকা শুক্ররস নির্গত হয়) ইত্যাদি বের হয়, তাহলে অযু ভেঙ্গে যাবে। না হয় শুধু খাহেশের নজর দিলে অযু ভেঙ্গে যাবে না।

 

৯। প্রশ্নঃ এক ব্যক্তির হাত কিংবা পা ফাটা থাকার কারনে মােম গালিয়ে ফাটা বন্ধ করে অযু করেছে, তার এ অযু দুরুস্ত হয়েছে কি না?

উত্তরঃ যদি ফাটা জায়গায় পানি পৌছলে ক্ষতি না হয়, তাহলে পানি পৌছাতেই হবে। নতুবা অযু হবে না।

কিন্তু যদি ফাটা জায়গায় পানি পৌছানাে ক্ষতিকর হয়, তাহলে মােম লাগিয়ে উপর দিয়ে পানি ঢেলে দেয়া জায়েয আছে।

-গুনইয়াতুল মুস্তামলী ও পৃঃ ৪৮

 

১০। প্রশ্নঃ কারাে যদি নাকের ময়লার সাথে জমাট রক্ত বের হয়, অথবা কফের সাথে জমাট রক্ত বের হয়, তাহলে অযু ভেঙ্গে যাবে কি না?

উত্তরঃ নাকের ময়লা বা কফের সাথে জমাট রক্ত বের হলে অযু ভাঙ্গবে না।।

 

১১। প্রশ্নঃ অযুদার ব্যক্তি যদি খিলখিল করে অর্থাৎ, দাঁত দেখিয়ে উচ্চ স্বরে হাসে, তাতে তার অযু ভেঙ্গে যাবে কি না?

উত্তরঃ অযুদার ব্যক্তি যদি নামাযের বাইরে আওয়াজ দিয়ে দাঁত দেখিয়ে হাসে এতে অযু ভাঙ্গবে না এবং জানাযার নামাযের মধ্যেও যদি এরূপভাবে দাঁত বের করে হাসে, তাতেও অযু ভাঙ্গবে না কিন্তু জানাযার নামায ভেঙ্গে যাবে। আর যদি ওয়াক্তিয়া নামাযের মধ্যে খিলখিল করে হাসে, তাহলে নামায এবং অযু উভয়টি ভেঙ্গে যাবে।

প্রকাশ থাকে যে, নামায অবস্থায় অট্ট হাসি দিলে অযু ভেঙ্গে যাওয়া এটা কিয়াস পরিপন্থী। হুকুম, যুক্তিতে বুঝে না আসলেও মেনে নিতে হবে। কারণ এটা নবী কারীম সাঃ এর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। -ফাতাওয়া দারুল উলূমঃ ১/১৪৮

 

১২। প্রশ্নঃ অযু করার সময় যদি অযুর অংগ-প্রত্যঙ্গ হতে কোন অংশ শুকনা থাকে, পরে তা নজরে পড়ে, এখন কি শুধু সে অংশটুকু ধুলেই দুরুস্ত। হবে? না পুনরায় অযু আবার করতে হবে?

উত্তরঃ শুধু ঐ শুকনা অংশটুকু ধুলেই অযু পরিপূর্ণ হয়ে যাবে, পুনরায় অজু করতে হবে না।  -ফাতাওয়া দারুল উলূম ঃ ১১৪৭। ১৫।

 

১৩। প্রশ্নঃ নবী কারীম সা. এর পেশাব, পায়খানা, রক্ত ইত্যাদি পবিত্র ছিল কি না এবং এগুলাে শরীর থেকে নির্গত হলে শরীর মুবারক নাপাক হত কি না?

উত্তরঃ নবী কারীম সা. এর পেশাব, পায়খানা, বীর্য, রক্ত ইত্যাদি পবিত্র ছিল।

কিন্তু উম্মতের শরীর থেকে এগুলাে বের হলে যেমন-গােসল ফরয হয়ে যায় বা অযু ভেঙ্গে যায়, তদ্রুপ নবী কারীম সা. এর শরীর মুবারক হতে বের হলেও অযু ভেঙ্গে যেত বা গােসল ফরয হয়ে যেত। -ফাতাওয়া দারুল উলুম ঃ ১/১৪৫।

 

১৪। প্রশ্নঃ নবীদের ঘুম অযু ভঙ্গকারী কি না?

উত্তরঃ আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের ঘুম অযু ভঙ্গকারী ছিল না। -রদুল মুহতারঃ ১/ ১৩৩।

 

১৫। প্রশ্নঃ মহিলাদেরকে স্পর্শ করলে অযু ভাঙ্গবে কি না?

উত্তরঃ পুরুষের বিশেষ অঙ্গ যদি মহিলার বিশেষ অঙ্গের সাথে কোন পর্দা ব্যতীত স্পর্শ করে অথবা এক মহিলার বিশেষ অঙ্গ আরেক মহিলার বিশেষ অঙ্গের সাথে পর্দা ব্যতীত স্পর্শ করে অথবা এক পুরুষের বিশেষ অঙ্গ আরেক পুরুষের বিশেষ অঙ্গের সাথে পর্দা ব্যতীত স্পর্শ করে এবং পুরুষাঙ্গটি দন্ডায়মান হয়, তাহলে না ভিজলেও অযু ভঙ্গ হয়ে যাবে।।

তাছাড়া শুধু মাত্র কোন মহিলাকে হাতে স্পর্শ করলেই অযু ভঙ্গ হবে না,যতক্ষন পর্যন্ত কিছু বের না হবে। -দুররে মুখতার ও ১/১৩৬

 

১৬। প্রশ্নঃ কোন ঘুম অযুকে ভেঙ্গে দেয়?

উত্তরঃ শুয়ে ঘুমালে অযু ভেঙ্গে যায়। কিন্তু যদি নামাযের মধ্যে দাড়িয়ে অথবা বসে বা সেজদারত অবস্থায় ঘুমায়, তাহলে অযু ভঙ্গ হবে না এবং উল্লেখিত অবস্থাগুলােতে যাদের সব সময় পিছনের রাস্তা দিয়ে হাওয়া বের হতে থাকে তাদের ঘুমও অযু ভঙ্গকারী নয়।

-দুররে মুখতার ও ১/১৩১।

 

১৭। প্রশ্নঃ কারাে যদি ঘন দাড়ি থাকে, তাহলে সেগুলাে ধােয়া বা দাড়ির  গােড়ায় পানি পৌছানাে জরুরী কি না?

উত্তরঃ সব দাড়িই ধােয়া ফরয। মাসেহ করা যথেষ্ট নয়। কিন্তু দাড়ি যদি ঘন হয়, তাহলে দাড়ির নিচে চামড়া পর্যন্ত পানি পৌছানাে ফরয বা জরুরী নয়। আর যদি এমন পাতলা দাড়ি হয় যে, চামড়া দেখা যায় তাহলে চামড়া পর্যন্ত পানি পৌছানাে জরুরী। -দুররে মুখতার ৪১/৯৩। ২৩।

 

১৮। প্রশ্নঃ অযুর মধ্যে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা জায়েয আছে কি না?

উত্তরঃ  অযুর মধ্যে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা মাকরূহ। যেমন- ওযর ব্যতীত তিন বারের বেশী ধােয়া মাকরূহে তাহরীমী।।

নুরুল ইযাহ, রদ্দুল মুহতার : /১৪৫।

 

১৯। প্রশ্নঃ অযুর পর হাত, পা, এবং মুখের পানি কোন কাপড় দ্বারা মুছে ফেলা জায়েয আছে কি না? উত্তরঃ অযুর পর হাত, পা, চেহারা ইত্যাদির পানি না মােছাও জায়েয আছে এবং মুছে ফেলাও জায়েয আছে। তবে এমন ভাবে মুছবে, যাতে অযুর আসর বা নিদর্শন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বাকী থাকে। এটাই আদব বা মুস্তাহাব।  -রব্দুল মুহতার : ১/১২১।

 

২০। প্রশ্নঃ এক ব্যক্তি অযু করছে । ঐ দিক দিয়ে জামা’আত প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখন এ ব্যক্তি শুধু অযুর ফরযগুলাে আদায় করে জামা’আতে শরীক হওয়া উচিত হবে, না অযুর সমস্ত সুন্নত সহ আদায় করে প্রয়ােজনে একাকী নামায আদায় করবে? উত্তরঃ অযুর সুন্নতগুলাে পুরা করা জরুরী। যদিও জামা’আত শেষ হয়ে যায়।

কারণ, রাসূল সা. বলেছেনঃ অযুর সমস্ত ফারায়েয ও সুনান সহ আদায় করে অযু সম্পন্ন কর। -মেরকাত ঃ ১/৩১০। ৩০

 

উত্তরগুলো সম্পাদন করেছেনঃ মাওলানা নোমান আহমদ।

বইয়ের নামঃ সাড়ে পাঁচশত মাসায়েল

 

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।