রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের সংবাদ যিনি শুনতেন, তিনিই হতভম্ব এবং নির্বাক হয়ে যেতেন। আবু বকর রা: কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। উমর রা: তো হুঁশ হারিয়ে ফেলেন আর বলেন, যে বলবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন, তার গর্দান উড়িয়ে দেব। হযরত উসমান রা: বাকরুদ্ধ হয়ে পরেন। আলী রা: নড়াচড়া করার মত শক্তি হারিয়ে ফেলেন। এই ছিল মহান চার খলিফার অবস্থা আর বাকীদের অবস্থা তো কেমন ছিল তা অনুমেয়। 

আজকের এই লেখায় সংক্ষিপ্ত আকারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের দিনের বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করবো ইনশা আল্লাহ।

হযরত মুহাম্মদ সা: এর ইন্তেকালের দিন

দিনটি ছিল সোমবার। অধিকাংশ উলামায় কেরামের মত হল, একাদশ হিজরির ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার দিন চাশতের সময় আর ইংরেজি ৯ই জুন ৬৩২ খৃ:  আয়েশা রা. এর কোলে মাথা রেখে ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতা

একাদশ তম হিজরির মুহররম মাসে রাসূল সা. জ্বরে আক্রান্ত হন এবং ক্রমে জ্বর বৃদ্ধি পেতে থাকে। রোগ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে লাগলো। রাসূল সা. তাঁর অনান্য স্ত্রীদের নিকট হযরত আয়েশা রা: এর কক্ষে অবস্থান করার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলেন। সকল স্ত্রী সানন্দে অনুমতি প্রদান করলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রা: ঘরে থাকলেন। তারপর বাহিরে বের হয়ে তিনি বয়ান দিলেন এবং বললেন,

আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। আল্লাহ তায়লা তোমাদের হেদায়েত দান করুন। আমি তাঁকে তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি। আর তোমাদেরকে তাঁর নিকট সোপর্দ করছি। আমি তোমাদেরকে জাহান্নাম সম্পর্কে সাবধান করছি এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছি। আল্লাহর বান্দারা! তোমরা গর্ব ও অহংকার করবে না। জান্নাত তারাই পাবে, যারা অহংকার ও ফ্যাসাদ করে না। আখিরাতের কল্যাণ মুত্তাকীদের জন্য। অহংকারীদের ঠিকানা জাহান্নাম।

তারপর তিনি বললেন:

আমাকে আমার নিকট আত্মীয় গোসল করাবে।

এরপর বললেন:

আমার লাশ আমার কবরের কাছে রেখে কিছুক্ষণের জন্য তোমরা দূরে সরে থাকবে, যাতে ফেরেশতারা আমার জানাজা পড়তে পারে। এরপর দলে দলে আমার জানাজা পড়বে। প্রথমে আমার খান্দানের পুরুষরা জানাজা পড়বে। তারপর স্ত্রীলোকেরা। রোগের শেষ অবস্থায় তিনদিন পর্যন্ত তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন।

ওফাতের দিনের ঘটনা

ফজর নামাজ পড়া শেষ করে সিদ্দীকে আকবর হযরত আবু বকর রা: মসজিদ থেকে বের হয়ে সোজা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কামরায় এসে ঢুকলেন। হযরত আয়েশা রা: কে বললেন, আজ দেখছি রাসূল সা. বেশ শান্ত অবস্থায় রয়েছেন। যে অস্থিরতা ও ব্যথা বেদনায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন তা নেই। মূলত সেই দিন আবু বকর সিদ্দীক রা: সেই স্ত্রীর সাথে থাকার দিন, যিনি মদিনা থেকে ১ ক্রোশ দূরে থাকতেন। তাই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শারীরিক অবস্থা ভাল দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতি নিয়ে মদিনার বাহিরে সেই স্ত্রীর কাছে চলে গেলেন।

অন্য সকল সাহাবীও জানতে পারলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীরের অবস্থা এখন ভাল, তাই সবাই নিজ নিজ ঘরে চলে যান। কিন্তু তার কিছু সময় পর  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পূর্বকালীন অবস্থা শুরু হয়ে গেল। তিনি হযরত আয়েশা রা: কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরলেন। অতঃপর মিসওয়াক করলেন এবং তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূত পবিত্র আত্মা ঊর্ধ্ব জগতে যাত্রা করলো। নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে, আল্লাহ সাথে মিলিত হলেন।  

গোসল ও কাফন-দাফন

গায়ের কাপড় গায়ে রেখেই মঙ্গলবার দিন গোসল দেয়া হয়। গোসলের সময় হযরত আব্বাস রা: তাঁর ২ ছেলে ফযল রা: এবং কাছেম রা: সহ হযরত আলী রা: , হযরত উসমান রা:, হযরত শক্বরান রা: এবং আউস ইবনে খাওলা রা: শরীক ছিলেন।

তিনটি সাদা ইয়েমেনী চাদরে কাফন দেয়া হয়। জামা ও পাগড়ী ব্যতীত শুধু ৩টি চাদর দিয়ে কাফন দেয়া হয়।

মঙ্গলবার দিনে জানাজার নামায আদায় করা হয়। হুজরা মোবারক ছোট ছিল, ফলে ১০ জন করে সাহাবী ভিতরে গিয়ে নামাজে জানাজা পড়াতেন। প্রথমে বনী হাশেম, তারপর মুহাজির, অতঃপর আনসার। এভাবে পুরুষদের পড়া শেষ হলে মহিলা অতঃপর বাচ্চারা জানাজার নামায আদায় করে। প্রায় ৩০ হাজার লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জানাজার নামাজ আদায় করেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমাহিতের স্থান নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন সাহাবী বিভিন্ন মত প্রদান করেন। পরে হযরত আবু বকর রা: বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন নবীগন যেখানে মৃত্যু বরণ করে সেখানেই তাদেরকে সমাহিত করা হয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর খনন করেছিলেন হযরত আবু তালহা রা:। হযরত আলী রা: এবং হযরত আব্বাস রা: এর দুই ছেলে ফজল রা: এবং কাছেম রা: শরীর মোবারক কবরে অবতরণ করান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের উপরের অংশ ছিল উটের পিঠের ন্যায় উঁচু। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর মুবারকে পানি ছিটিয়ে দেন হযরত বেলাল রা:। বুধবার দিন রাতে দাফন কাজ সম্পূর্ণ করা হয়।

এই ছিল একজন মহামানবের জীবনের শেষ দিন। এই সংক্ষিপ্ত লেখায় সব কিছু তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায় আমাদের গোটা মানবজাতির জন্য হৃদয় বিদারক।

সূত্র:

১. সীরাতে মুহাম্মদে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

২. সীরাতে মুস্তফা

৩. আসাহহুস সিয়ার

৪. আর রাহীকুল মাকতুম

৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া

৬. ইসলামের ইতিহাস

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।