রাসূল সা এর পোশাক পরিচ্ছেদ কেমন ছিল? পোশাক পরিচ্ছেদের কথা চিন্তা করলে অনেকের মনে শুধু জুব্বার কথা আসে। আসলে পোশাক পরিচ্ছেদের মধ্যে টুপি এমনকি মোজাও অন্তর্ভুক্ত।

রাসূল সা: এর এই পোশাক পরিচ্ছেদ আমাদের জন্য অনুসরণীয়। আজকাল আমরা পশ্চিমা আর বিভিন্ন সিনেমার নায়কদের পোশাক পরিচ্ছেদকে অনুসরণ করি।

অথচ আমাদের অনুসরনীয় ব্যক্তি একমাত্র রাসূল সা: এবং মাপকাঠি সাহাবায় কেরামগন। যদি পোশাক পড়তে হয়, তাহলে রাসূল সা: এর প্রিয় পোশাক পরিধান করাই উত্তম। তাই, কথা না বাড়িয়ে রাসূল সা: এর পোশাক পরিচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা করা যাক।

রাসূল সা এর পোশাক

রাসূল সা: এর পোশাক

রাসূল সা: এর জামা, লুঙ্গী ও চাদরের বর্ণনা

রাসূল সা: সাধারণত লুঙ্গী পরিধান করতেন। উসওয়ায়ে কিতাবে এসেছে, অধিকাংশ সময় রাসূল সা. এর পরনে লুঙ্গী ও চাদর থাকত। যা খুব শক্ত ও মোটা হত। মাদারিজুন নবুওয়ত গ্রন্থে আছে যে, রাসূল সা. ময়লা ও দুর্গন্ধ যুক্ত বস্ত্র অপছন্দ করতেন।

রঙের ক্ষেত্রে রাসূল সা: সাদা রঙের পোশাক পছন্দ করতেন। হযরত সামুরা ইবনে জুনদুন রা. বর্ণনা করেন, নবী আকরাম সা. বলেছেন, সাদা বস্ত্র পরিধান কর, কেননা এটা অত্যন্ত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। আর এর দ্বারাই (সাদা কাপড়) তোমরা মৃত ব্যক্তিদের দাফন কর।

অপরদিকে, যাদুল মা’আদে আছে, তিনি ইয়ামানী চাদর, জোব্বা, আলখাল্লা, জামা, লুঙ্গী ইত্যাদি সব বস্ত্র ব্যবহার করতেন। তিনি রেখা পাইর-যুক্ত কালো বস্ত্র এবং সাদা বস্ত্র পরিধান করেছেন।

পোশাকের সাইজ

পোশাকের বর্ণনা করতে গিয়ে, কবি মুযতার উল্লেখ করেন,

অধিক সময় পরতেন তিনি সাদা, মোটা আরাম হীন কাপড়, লম্বা খাটো খুব বেশী নয়, গোড়ালি হতে একটু উপর। কালো কম্বল জড়াতেন কভু পবিত্র দেহের উপর| রাসুল (সা.)-এর জামা মোবারক মোল্লা আলী বারী রহঃ দিময়াতী রহঃ হতে বর্ণনা করেন, প্রিয় নবীর সা. জামা সুতি কাপড়ের বানানো ছিল, যা খুব লম্বা ছিল না এবং এর আস্তিনও ছিল না। এমনিভাবে মুনাবী রহঃ ইবনে আববাস রাযি. হতে বর্ণনা করেন, তার জামা টাখনুর একটু উপরে থাকত।

খোসায়েলে নববী ৪৯ পৃষ্ঠা

শামায়েলে তিরমিযীতে জামার হাতার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত আসমা রা. বলেন, রাসূলের সা. জামার হাতা কব্জি পর্যন্ত হত। এছাড়াও আলখাল্লার হাতা কব্জির আগ পর্যন্ত বানিয়েছিলেন| এটা এ কথা বুঝানোর জন্য কব্জির আগ পর্যন্ত হাতা বানিয়েছেন। অন্যথায় উত্তম ও সুন্নত হল হাতা কি পর্যন্ত হওয়া। তবে, এর একটু আগ পর্যন্ত হওয়াটাও জায়েজ। কিন্তু হাতা লম্বার পরিমাণ আঙ্গুল অতিক্রম করা চাই।

জামার লম্বার ব্যাপারে আল্লামা শামী রহ. লিখেন, জামা পায়ের নলীর অর্ধেক পর্যন্ত হওয়া চাই; এর, বেশী নয়| এটাই উত্তম। তাছাড়া টাখনু পর্যন্তও জায়েজ; কিন্তু অনুচিত| নবী কারীম সা. জামার হাতা খুব চিপাও রাখতেন না আবার খুব টিলাও রাখতেন না, বরং মাঝামাঝি ধরনের রাখতেন এবং জামার হাতা কব্জি পর্যন্ত লম্বা হত| আলখাল্লার হাতার চেয়েও বর্ধিত হত| তবে আঙ্গুল অতিক্রম করত না।

উসওয়ায়ে রাসূ্‌ল সা. ১২২ পৃষ্ঠা

রাসূল (সা.)-এর চাদর মোবারকের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ

রাসূল (সা.)-এর চাদর মোবারক চার হাত লম্বা ও আড়াই হাত প্রশস্ত ছিল। অন্য এক বর্ণনা মতে ছয় হাত লম্বা ও সাড়ে তিন হাত প্রশস্ত ছিল।

খাসায়েলে নববী ৯৫ পৃষ্ঠা

নবীজি সা. কালো কম্বলও গায়ে জড়াতেন| হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণনা করেন, একদা তিনি সকাল সকাল বাইরে গমন করলেন, তখন তার গায়ে কালো পশমের একটি চাদর ছিল।

মুসলিম শরীফ ২য় খন্ড, ১৯৪ পৃষ্ঠা

রাসূল (সা.)-এর টুপি মোবারক

তিনি সাদা রঙ্গের টুপি ব্যবহার করতেন। কিন্তু সফর ও নিজ বাড়ীতে অবস্থানকালে টুপির ধরন ভিন্ন হত। তিনি যখন বাড়ীতে অবস্থান করতেন, তখন মাথায় চেষ্টা ধরনের টুপি ব্যবহার করতেন|

উসওয়ায়ে রাসূল (সা.) ১২৪ পৃষ্ঠা, সীরাজুম মুনির নববী লায়ল ও নাহার ১১১ পৃষ্ঠা

রাসূল (সা.)-এর পাগড়ী মোবারক

রাসূল (সা.) অধিকাংশ সময় পাগড়ী ব্যবহার করতেন আর বলতেন, “পাগড়ী ব্যবহার কর, এর দ্বারা ভদ্রতা বাড়ে”। কখনো যদি পাগড়ী না হত, তখন শির ও ললাটের মাঝে একটি পট্টি হলেও বেঁধে নিতেন।

নবীজির পাগড়ী মোবারকের রঙ

হযরত আমর ইবনে হারিস রাযি. বলেন, এ দৃশ্যটা যেন এখনো আমার চোখের সামনে ভাসমান, যখন নবীজি (সা.) মিম্বরে খুতবা প্রদান করছিলেন এবং কালো রঙ্গের একটি পাগড়ী রাসূল (সা.)-এর (শির) মাথায় বাধা ছিল।

মুসলিম, নাসায়ী

হযরত জাবের রাযি. বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন যখন তিনি মক্কা শরীফে প্রবেশ করলেন, তখন তার মাথায় কালো রংয়ের পাগড়ী ছিল।

রাসূল সা. এর শামলা প্রায় অর্ধ হাত লম্বা রাখতেন| অধিকাংশ সময় শামলা ছেড়ে পাগড়ী বাধতেন এবং শামলাকে উভয় স্কন্ধের মাঝামাঝি পেছনের দিকে ছেড়ে রাখতেন|

খাসায়েলে নববী, নববী লায়ল ও নাহার, ৪১১ পৃষ্ঠা

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. বলেন, রাসূল সা. যখন পাগড়ী বাঁধতেন, তখন শামলাকে উভয় স্কন্ধের মাঝারি পেছনে ঢেলে দিতেন । পাগড়ী মোবারক প্রায় সাত গজ লম্বা ছিল।

খাসায়েলে নববী, নববী লায়ল ও নাহার

রাসূল সা.-এর মাথা মোবারকে কাপড় রাখার আলোচনা

হযরত আনাস (রাযি.) বলেন, তিনি প্রায়ই মাথায় কাপড় রাখতেন| তার এই কাপড়খানা অধিক তৈল লাগার কারণে তৈলযুক্ত কাপড় বলেই মনে হত|

এই কাপড়টা পাগড়ীর নিচে রাখতেন, যাতে তৈলের দরুন পাগড়ী নষ্ট না হয়ে যায়। কিন্তু তথাপি এই কাপড়টি ময়লা হত না ।

মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ) লিখেন, তার কাপড়ে উকুন পড়ত না কখনো । কখনো উরুশ তার রক্ত চুষতে পারত না । আল্লামা রাযী (রহঃ) বর্ণনা করেন, প্রিয় নবীজি (সা.)-এর দেহ মোবারকে কখনো মাছি বসে নাই।

খাসায়েলে নববী ১০০ পৃষ্ঠা

প্রিয় নবীজি (সা.)-এর চামড়ার মোজা মোবারক

প্রিয় নবীজি (সা.) চামড়ার মোজা পরিধান করতেন এবং এগুলির উপর মাসাহ করতেন| হযরত বুরাইদা (রাযি.) বলেন, হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশী প্রিয় নবীজি (সা.)কে কালো রঙ্গের দু’টি পরিস্কার মোজা উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। রাসূল (সা.) এগুলি ব্যবহার করেছেন এবং ওযুর পর এগুলির উপর মাসাহ করেছেন।

হযরত মুগীরা ইবনে শোবা রাযি. বলেন, দাহিয়া কীলবী (রাযি.) রাসূল (সা.)কে দু’টি মোজা উপহার দিয়েছিলেন। নবীজি (সা.) এগুলি ব্যবহার করতে করতে শেষ পর্যস্ত ফেটে গিয়েছিল।

পরিশেষে

এই ছিল আজকে রাসূল সা: এর রাসূল সা: এর পোশাক পরিচ্ছেদ নিয়ে আলোচনা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে রাসূল সা:কে অনুসরণ করার তৌফিক দান করুক। আমীন। আরও জানতে জেনে নিন, কেমন ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেশভূষা ও সাজ-সজ্জা।

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।