ইসলামের প্রচার-প্রসার ও মুসলিমদের উন্নয়নে যে সকল মুসলিম মনীষীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের মধ্য থেকে ০৪ জন আল্লাহ ওয়ালার বিনয়ের বিরল ঘটনা নিয়ে আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ।

০১। হযরত শাইখুল হিন্দের একটি ঘটনা।

জনৈক ব্যক্তি তাকে খানা খাওয়ার দাওয়াত দিলে তিনি তা কবূল করলেন। তার গ্রামটি ছিল বেশ দূর। কিন্তু সে লােকটি সওয়ারির কোন ব্যবস্থা করেনি। যখন খাবারের সময় হল, হযরত পদব্রজেই রওয়ানা হলেন। এটাই তাে বিনয়ের বিরল ঘটনা যে, মনের মধ্যে এতটুকু খেয়াল আসেনি যে লােকটি বাহনের ব্যবস্থা করেনি এটা করা তার উচিৎ ছিল ইত্যাদি।

মােটকথা তার বাড়িতে গিয়ে আহার পর্ব শেষ করলেন। অতঃপর যখন ফিরে আসছেন তখনও সে কোন আরােহনের ব্যবস্থা করে নি বরং উল্টো আমের বস্তার এক বিরাট বােঝা চাপিয়ে দিয়ে বলল, হযরত এই আমগুলি বাড়িতে নিয়ে যান। আমন্ত্রণকারী এটা চিন্তা করে দেখেনি, দূরের পথ কোন বাহন নেই কিভাবে নেবেন।

লােকটি এত বড় আমের বস্তা দিয়ে দিলে হযরত নিশ্চিন্তে তা কবুল করে নিলেন এবং বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করেন। মাওলানা গােটা জীবনে এমন ভারী বোঝা কোন দিন বহন করেন নি। শাহজাদার ন্যায় জীবন যাপন করেছেন। এখন আমের ব্যাগ কখনও ডান হাতে নেন, আবার কখনও বাম হাতে নেন, এভাবেই পথ চলছেন।

যখন দেওবন্দের কাছে পৌছেন তখন দুই হাতের অবস্থা এমন হয়েছে যে আর সহ্য হচ্ছে না, কোন হাত দিয়েই আর ধরতে পারছেন না, ব্যথায় কুকড়ে গেছে, না ডান হাতে স্বস্তি আছে না বাম হাতে স্বস্তি আছে, অবশেষে বস্তাটি মাথায় তুললেন মাথায় নিয়ে পথ চলছেন। এখন হাত দুটিতে আরাম লাগছে তখন নিজেকে সম্বােধন করে বলতে লাগলেন, তুমি তাে বড় আশ্চর্য লােক এতক্ষণে খেয়াল হল না যে ব্যাগটা মাথায় উঠিয়ে পথ চল, আগে থেকে মাথায় নিলে হাত দুটিরতাে এত কষ্ট হতাে না।

এখন মাওলানা এই অবস্থাতেই দেওবন্দে প্রবেশ করছেন। লােকজন সালাম করছেন তিনি উত্তর দিচ্ছেন। কেউ মুসাফাহা করতে চাইলে এক হাত দিয়ে মাথার বােঝা সামলিয়ে অন্য হাত দিয়ে মুসাফাহা করছেন। এভাবেই শেষ পর্যন্ত হযরত শাইখুল হিন্দ বাড়িতে পৌছলেন।

হযরত মাওলানা মাহমূদুল হাসানের মনে কিঞ্চিত খেয়াল হল না আমি বড় আলিম। সামান্যতম চিন্তা করলেন না যে, আমাকে শাইখুল হিন্দ বলা হয়। এমন কাজ করলে আমার সম্মানের হানি হবে! এটাই হল বিনয়ের দৃষ্টান্ত যা বিরল।

 

০২। হযরত সায়্যেদ সুলাইমান নদবীর বিনয় |

যার জ্ঞান-গরিমার ডংকা সবখানে বাজতে থাকে, পাখ-পাখালির কণ্ঠে যার ইলমের বুলি শুনা যায়, সেই মহা পণ্ডিত সুলাইমান নদবী নিজের ঘটনা বয়ান করেন, যখন আমি ‘সীরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” গ্রন্থ ষষ্ঠ খণ্ড সম্পন্ন করি বারবার মন মুকুরে একটি কথা উঁকি মারছে, সেই মহান পাক সত্তার জীবনী গ্রন্থ লিখেছি তাঁর পবিত্র সীরাতের কোন প্রতিচ্ছবি বা নূরের ঝলক আমার জীবনের মধ্যে কিঞ্চিত মাত্রও এসেছে কি-না।

যদি না এসে থাকে তবে কিভাবে আসতে পারে সেই চিন্তা শুধু পীড়া দিচ্ছে, ব্যথিত করছে মন ও হৃদয়। এই লক্ষ্যেই কোন আল্লাহ ওয়ালার সন্ধান করতে থাকি। ইতিমধ্যে  সংবাদ পেয়েছি থানা ভবনে নিজের খানকাতে মাওলানা আশরাফ আলী থানবী অবস্থান করছেন।

আল্লাহ পাক  তাঁর ফয়েয ছড়িয়েছেন। একবার থানা ভবন যাওয়ার ইচ্ছা করলাম। অবশেষে একদিন থানাভবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি।

সফর শেষে কদিন সেখানে থেকে বরকত হাসিল করতে থাকি ও গভীর ভাবে তায়াল্লুক কায়েম করি। ফিরে আসার সময় হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী। (রহ)-এর নিকট আরয করি,

হযরত! কিছু নছীহত পেশ করুন মেহেরবানী পুর্বক। হযরত থানবী (রহ.) বললেন, আমি এক্ষুনি ভাবতেছিলাম এত বড় আল্লামা কে কী নছীহত করবাে। বিদ্যা-বুদ্ধিতে যার যশ ও খ্যাতি বিশ্বময়, তাই আমি আল্লাহ তাআলার নিকট দু’আ করছি, হে আল্লাহ আমার দিলে এমন কথা ঢেলে দিন যা তার জন্যও উপকারী হয় এবং আমার জন্যও উপকারী হয়।

এরপর মুজাদ্দিদুল মিল্লাত হযরত থানবী (রহ.) হযরত সায়্যেদ সুলাইমান নদবী (রহ.)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন

ابال ہمارے طریق می تواول واخر اپنے آپ کو مٹا دینا ہے،

ভাই আমাদের এ পথের শুরু শেষ নিজেকে নিজে মিটিয়ে দেওয়া। হযরত সায়্যেদ সুলাইমান নদবী (রহ.) বলেন, হযরত হাকীমুল উম্মত শাহ আশরাফ আলী থানবী রহ. এ কথাগুলাে বলার সময় নিজের হাতকে বক্ষ থেকে নিচের দিকে এমন হেঁচকা টান দিলেন যে আমার অনুভব হল আমার দিলে হেচকা টান লেগে গেছে।

মুফতী তাকী উসমানী দা. বা. বলেন, আমাদের হযরত ডা. আব্দুল হাই (রহ.) বলেন, এই ঘটনার পর হযরত নদবী (রহ.) নিজেকে নিজে এমনভাবে মিটিয়েছেন যার তুলনা পাওয়া ভার। একদিন দেখলাম খানকার বাইরে হযরত সুলাইমান নদবী (রহ.) মজলিসে আগমনকারীদের জুতা সােজা করে দিচ্ছেন।

এই ত্যাগ ও বিনয় আল্লাহ তা’আলা তাদের অন্তরে পয়দা করে দিয়েছেন। এর ফলাফলে ফয়েয বরকতের সুগন্ধি ছুটলাে এবং আল্লাহ পাক দিগদিগন্তে তা পৌছে দিলেন।

 

০৩। হযরত শাইখুল হিন্দের বিনয়।

হযরত মাওলানা মুগীস সাহেব (রহ.) থেকে মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব (রহ.) ঘটনাটি শুনেছেন- আল্লামা তাকী উসমানী বলেন,

শাইখুল হিন্দ হযরত মাওলানা মাহমূদুল হাসান সাহেব (রহ.) ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারত স্বাধীনতা গণ আন্দোলনের এমন ডাক দিয়েছেন যা গােটা ভারতবর্ষ, আফগান, তুর্কীস্থান সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। সব দেশ দমিয়ে রাখে। তার খ্যাতি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

সকলেই শাইখুল হিন্দ নামে এক ব্যক্তিকেই চেনে, তিনি হলেন মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দী।

আজমীরে একজন খ্যাতনামা আলিম ছিলেন। নাম মাওলানা মঈনুদ্দীন আজমীরী। তাঁর সাধ জাগে দেওবন্দ গিয়ে হযরত শাইখুল হিন্দের (রহ.) সাথে সাক্ষাৎ করে সােহবাত হাছিল করার। রেলগাড়িতে চড়ে দেওবন্দ পৌছলেন আর স্টেশনে নেমে এক টাঙ্গাওয়ালাকে বললেন,

আমাকে মাওলানা শাইখুল হিন্দের নিকট যেতে হবে। সারা দুনিয়া যাকে শাইখুল হিন্দ বলে স্থানীয় লােকজনের নিকট তিন বড় মৌলভী সাব ‘হিসেবে পিরচিত। দেওবন্দেও তিনি বড় মৌলভী সাব হিসেবে প্রসিদ্ধ ।

টাঙ্গাওয়ালা জানতে চেষ্টা করে কি ভাই! বড় মওলবী সাহেবের কাছে যেতে ইচ্ছা করছেন না কি? তিনিও বললেন হ্যা ভাই বড় মৌলবী সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। সুতরাং গাড়ােয়ান তাকে শাইখুল হিন্দের বাড়ির সামনে নামিয়ে দেয়।

তখন গরমের সময় ছিল, দরজার কড়া নাড়তেই লুঙ্গী গেঞ্জী পরিহিত একজন ব্যক্তি বেরিয়ে আসলে তাকে উদ্দেশ্য করে আগন্তুক বললেন, আমি আজমীর থেকে এসেছি, হযরত মাওলানা শাইখুল হিন্দের সাথে মােলাকাত করতে, আমার নাম মঈনুদ্দীন।

তিনি বললেন হযরত! আসুন ঘরের ভেতরে বসুন। তারপর ঘরে গিয়ে বসতে বসতে বললেন, মাওলানাকে সংবাদ দিন যে মঈনুদ্দীন আজমীরী আপনার সাক্ষাতে এসেছে। তিনি বললেন হযরত! প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কষ্ট করে এসেছেন, তাশরীফ রাখুন এ কথা বলে পাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগলেন।

বেশ কিছুক্ষণ বাতাস করার পর আজমীরী পুনরায় বললেন, আমি তােমাকে বললাম মওলানাকে অবহিত কর যে আজমীর থেকে একজন লােক এসেছে। দেখা করতে। তখন তিনি বললেন আমি এক্ষুণি জানাচ্ছি। অতঃপর ঘরের মধ্যে গিয়ে খাবার নিয়ে আসলেন। মাওলানা আজমীরী বললেন, ভাই আমি খানা খেতে আসিনি আমি তাে মাওলানা মাহমূদুল হাসান সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। তার সাথে আমাকে দেখা করাও। তিনি বললেন হযরত! খানা খেয়ে নিন, এখনি সাক্ষাৎ হয়ে যাবে।

পানাহার শেষ করলেন, এ পর্যায়ে মাওলানা আজমীরী বিরক্ত বােধ করছেন। অবশেষে রেগে গিয়ে ধমক দিয়ে বলেই ফেললেন, আমি বারবার তােমাকে সংবাদ পৌছে দিতে বলছি যে হযরত মাওলানা শাইখুল হিন্দকে গিয়ে জানাও অথচ তুমি তাকে অবহিত না করে এটা সেটার মধ্যে ব্যস্ত রয়েছ।

অবশেষে তিনি বললেন, এখানে শায়খুল হিন্দ নামে কেউ নেই, অবশ্য বান্দা মাহমূদ এই অযােগ্যেরই নাম। এখন মাওলানা মঈনুদ্দীন সাহেব বুঝতে পারলেন এতক্ষণে আমি যার সাথে রুক্ষ মেজাজে কথা বলছি তিনিই হযরত মাওলানা শায়খুল হিন্দ সাহেব অর্থাৎ মাহমদুল হাসান দেওবন্দী।

 

০৪। হযরত মুফতী আযীযুর রহমান সাহেব (রহ.)-এর বিনয়।

মুফতী তাকী উসমানীর পিতা মুফতী শফী সাহেব এর উস্তাযে মুহতারাম এবং দারুল উলুম দেওবন্দের মুফতিয়ে আ’যম হযরত আযীযুর রহমানের ঘটনা।

তাকী উসমানী সাহেব স্বীয় পিতার নিকট শুনেছেন- তার বাড়ির আশপাশে কয়েকজন বিধবার বাড়ি ছিল। মুফতী সাহেবের দৈনন্দিন আমল ছিল যখন দারুল উলুম দেওবন্দের উদ্দেশ্যে বের হতেন তখন প্রথমে ঐ সব বিধবাদের বাড়ি গিয়ে খােজ খবর নিতেন, কারাে কিছুর প্রয়ােজন আছে কিনা, বাজার সওদা করা লাগবে কিনা?

তারা নিঃসংকোচে বলতেন আমার এটা সেটা লাগবে। তিনি বাজারে গিয়ে তা এনে দিতেন। কোন বিরক্তি বােধ করতেন না। এরপর ফতােয়া লেখার জন্য দারুল উলুম দেওবন্দ তাশরীফ রাখতেন।

মুফতী শফী সাহেব (রহ.) বলতেন, যে ব্যক্তি হিন্দুস্তানের মুফতিয়ে আযম তিনি বিধবাদের সদাই করার জন্য বাজারের গলিতে বার বার ঘুরতেন। বেশ ভুষা দেখে মনে হতনা যে, ইলম ও ফযলের পর্বত তিনি। কিন্তু এই বিনয়ের পরিণতি এই হয়েছে সারাবিশ্ব আজ তাঁর ইলমের ঋণে ধন্য।।

پوٹ نئی تیرے پیراہن سے بو تیری

কাঠাল পাকলে চার দিকে মৌ মৌ ঘ্রাণ ছােটে। এই সুগন্ধি আল্লাহ তা’আলার একান্ত দান। তার ইন্তেকাল এমন হালাতে হয়েছিল যে মুফতী সাহেবের হাতে ফতােয়া ছিল তিনি ফতােয়া লিখতেছিলেন এমতাবস্থায় তার রূহ মাওলার সান্নিধ্যে চলে যায়।

এই তাে ছিল আমাদের আকাবেরে দীনের সাদামাটা আচরণ ও জীবন যাপন। আল্লাহ পাক আমাদেরকেও তার কিঞ্চিত দান করুন। আমীন।

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।