সময়ে সময়ে যা হয়েছে, চেতনা ছিল তার উৎস। “চেতনা” এর সংজ্ঞাটা বিশারদদের হাতে থাকুক। বলি, এটি একটি “জলন্ত হৃদপিন্ড” যার শুরুটায় দৃশ্যত ব্যর্থতা আর শেষটায় পূর্ণ সফলতা। চেতনা বলতে বুঝি ‘ঈমানী চেতনা’। স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের শ্রেষ্ঠ আকুতি। এ ছাড়া আর যা আছে তা সবই নষ্ট ধ্যান-ধারণা।

এটা আমার মত, কাউকে বিশ্বাস করতে বলছি না। কিন্তু ইঙ্গিত করতে চাই সেই অতীতের দিকে যখন বিভিন্ন চেতনার নামে ধ্বংস চলছে। হাজার হাজার বিকারগ্রস্ত পৃথিবীটাকে চুষে চুষে সার শূন্য করেছে। আদি পিতা আদম আ. থেকে শুরু করে জাতির পিতা ইব্রহিম আ. পর্যন্ত এবং তার থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মাদ সা. পর্যন্ত, একদিকে ঈমানী চেতনা আরেক দিকে শত-সহস্র নামধারী শয়তানী মতলব বিরাজমান ছিল। কেয়ামত পর্যন্ত তাই থাকবে।

মুহাম্মাদে আরাবী সা. এর সময় কি হলো? ঈমানী চেতনায় বেষ্টিত তিনি এবং তার অনুসারীরা এক মেরুতে, আরেক মেরুতে গোত্রীয় ঐতিহ্য নামের চেতনাধারীরা। ঈমানীরা যেখানেই গেলেন সেখানেই তাদের প্রেরণা ছিল একত্ববাদের চেতনা। সব কষ্ট-যন্ত্রনাকে পায়ের নীচে পিষে রাসূল সা. এর নির্দেশে হাবশায় হিজরত এবং সেখানে নাজ্জাশীর আশ্রয় লাভ, তার সবই ছিল এই চেতনার সৃষ্টি। আর নাজ্জাশী? সেও ছিল এই চিরন্তন চেতনার ধারক। ফলে তার সামনে বিপর্যস্ত হয়েছিল কুরাইশ কুফ্ফার প্রতিনিধি দলের সব অযৌক্তিক অভিযোগ। তারপর আরও, আরও অনেক কিছু হলো এর রেশ ধরে।

সেই থেকে শুরু। মুসলিম মিল্লাত নতুন অস্তিত্বে পথ চলা শুরু করলো আর শয়তানও তার রূপ-সজ্জায় পরিবর্তন আনলো। সেই ইতিহাস সবারই জানা। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, সালফে-সালেহীন তারা সকলেই জীবন অতিবাহিত করেছেন। কিন্তু তাদের জীবন আমাদের ঘুণে ধরা জীবনের মত মড়মড়ে ছিল না। বরং তাদের জীবন ছিল পরিপুষ্ট, অর্থবহ জীবন। স্বর্ণখচিত মখমলে মোড়ানো ছিল একেকটি পদক্ষেপ। আর তাদের পরিবার গঠনের ভিত্তি ছিল “আত্তায়্যিবীনা লিত্ তায়্যিবাতে”র সূত্রে।

তারা যে স্বর্গীয় সুখ পৃথিবীতে পেয়েছিলেন, তার মানে এই না যে, দুনিয়াটা তাদের জন্য স্বর্গ ছিল। বরং তাদের পতিপক্ষ ছিল ঈমান বিনাশী শয়তানী চক্র। কিন্তু তারা জিতে গেছেন ঈমানী চেতনার সৌন্দর্যে। ঈমানী বলয়ে আবদ্ধ ও বিস্তৃত করেছিলেন নিজেদের জীবন। তাদের এমন কোন কাহিনী পাওয়া যায় না যে, তারা তাদের সময়ের ইসলাম বিরোধীদের কোন কালচার নিজেদের মাঝে ধারণ করেছিলেন। তারা তাদের বুকে যা ধারণ করতেন, লালন করতেন, বাস্তবায়নও করতেন সেটাই। আর তারা তাদেরকে দেখতেন আরা নতুন করে জীবন গোছানোর চেষ্টা করতেন। জীবনের অনেক কিছু হারিয়ে ফেলার কারণে আফসোস করতেন।

যেই যুগের কথা বলছি, সেই খাইরুল কুরুন ছিল পৃথিবীর জন্য, সব সৃষ্টির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ উপহার। যারা সেই সময়ের মূল্য দিয়েছিলেন তারা হয়ে গেলেন শ্রেষ্ঠ উত্তম মানুষ আর যারা এর অবমাননা করেছিলেন তারা হয়ে গেলো শ্রেষ্ঠ অধম। এই সময়ের পরও মুসলিম উম্মাহর জীবনে অনেক আভিজাত্য এসেছে আবার অনেক আভিজাত্য-গর্ব ধ্বসেও গিয়েছে। তার মূল কারণও ছিল ঈমানী চেতনার উপর অটল থাকা এবং না থাকা। এই বিষয়টিই ছিল মুসলিম উম্মাহর উত্থান পতনের মাপকাঠি। যুগে যুগে সৃষ্ট ইতিহাস তার সাক্ষী।

মুসলিম জাতির আতীতে এমন সিংহ-পুরুষও ছিল যার নাম শুনিয়ে শিশুদের ঘুম পাড়ানো হত। এমন বিড়াল-পুরুষও ছিল যারা মাত্র দু’পয়সা লাভের জন্য শত্রু পক্ষের চাকরের শুকর পুষতো। আর কিছু হায়েনা পুরুষও ছিল যাদের একজনই একটি জাতিকে ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু কারা অমর হয়েছেন, কারা মডেল হয়েছেন সেটা পুরুষ কাপুরুষ সবারই জানা। চেতনার রং ঢংয়ে যারা পূর্ণতা পেয়েছেন তারাই উত্তমতার সনদ পেয়েছেন।

আর যারা এর সাথে গাদ্দারী করেছে তাদের চৌদ্দসীমা কীট-পতঙ্গে ভরে গেছে। পূর্বপুরুষের ধারা টেনে এনে বলি – যেই চেতনা বুকে লালিত হয় সেটা প্রকাশ করে দেওয়াই শ্রেষ্ট সাহসিকতার কাজ। কারণ জ্বীন শয়তান, মানুষ শয়তান কোন শয়তানই বসে নেই। সবাই নিজেরটা প্রকাশ করছে। অন্যকে প্রভাবিত করছে। বেশ সফলতাও পাচ্ছে।  এখন কেউ যদি হৃদয়ে চেতনা সুপ্ত রেখে বলে- আমি ভয় পাই। তাহলে তাকে অবনত ইতিহাসের একজন ভীরু ছাড়া আর কি বলা যায়?

এমন অনেক মানুষই হয় যারা মনে মনে লালন করে ইলাহি বিশ্বাস  ও চেতনা কিন্তু তাদের দ্বারা প্রকাশ পায় অন্যটা। এর কারণ কী? কারণ হল তাদের উপর শয়তানী ধ্যান ধারণার প্রভাব। এমনটাই হয়, হচ্ছেও। জাতির অনেক স্বপ্ন ও সম্ভাবনার মানুষগুলো এমন এক চক্রে আটকা পড়েছে যেখান থেকে উত্তরণের পথ সেটাই যেটা তাদের হৃদয় তাদের অজান্তে গোপনে গোপনে ধারণ করে।

ধরা যাক- এক ঝাক তরুণ। যারা তাদের মেধা, বহুমূখী প্রতিভা, সক্রিয় কাজকর্ম দিয়ে সমাজে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে। আর তারা তাদের জীবন ব্যবস্থাপনায় ইসলামী আইন ফলো করে। অস্থির সময়ে বুকে আগলে রাখে আল্লাহর সেই বাণী “লা-তাক্বনাতু মির রহমাতিল্লাহ।” হঠাৎ করেই তাদের চোখে ধরা পড়ল এক ভাসমান জৌলুস, না জমিনে তার কোন ভিত্তি আছে না  আসমানে তার কোন নিয়ন্ত্রণকারী আছে। তখন তাদের চোখ উঠল সেই জৌলুসে ঢুকার বাসনায়। বড়দের বাঁধা অমান্য করেই তারা ঢুকে পড়ে সেখানে। চ্যলেঞ্জ ছুড়ে দেয় বড়দেরকে। সেখান থেকে তারা অনেক সোনা-মানিক-রতন নিয়েই তবে ফিরবে।

এটা হলো বাস্তব কাহিনী। এর ফলাফল যা হয় তা হলো দু’রকম। একদল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যপারে পেরেশান হয়ে নেতিয়ে পড়ে, আরেক দল নিজেকে হারাতে হারাতে হরর জগতে নিয়ে যায়। আর রাতকে ভাবে দিন, দিনকে ভাবে রাত। অথচ একসময় তাদের হৃদয় ছিল উৎকৃষ্ট, বলিষ্ট চেতনায় উদ্ভাসিত ছিল। তাদের ভাবনাগুলোর উজ্জলতা সূর্যের আলোকেও হার মানাতো। কিন্তু বড়দের পরামর্শের প্রতি অনীহা এবং তারুন্যের তরতর স্বভাবকে নিয়ন্ত্রন করতে না পারা তাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

এক যুবকের গল্প-

                         ইসলামী আইনে টইটম্বুর তার জীবন। নোংরা সমাজে তার সভ্য চলাফেরা দেখে দর্শকের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। যুবক নয় যেন আস্ত একটা এ্যাঞ্জেল। মাথায় সবসময় ঘুরঘযুর করতে থাকে সমাজ পরিবর্তনের চিন্তা। সিদ্ধান্ত নিল ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা অর্জনের। বেছে নিল ‘আইন’। এর পিছনে সে অনেক যুক্তি দাড় করালো। যাদিও তার যুক্তিগুলোর যৌক্তিকতায় আল্লাহর আইনের কোন সমর্থন নেই। তারপর সে সম্পন্ন করল একেক করে সব ডিগ্রি। সর্বশেষ বিলেতের বার এট’ল। তারপর যা হওয়ার তাই হলো। সে তার যুক্তি মোতাবেক কাজ শুরু করলো।

তারপর পূর্বের চিন্তা আর বর্তমান কাজ, দুটোর মাঝে আকাশসম ফারাক। কিন্তু ততদিনে তার যৌবনের অনেক মূল্যবান সময়ও শেষ। এখন মাথায় হাতের উপর হাত। “হতাশুন আলাল হতাশা।” পূর্ব থেকে যা নির্ধারিত তা হবেই। এ্যাকাডেমিক শিক্ষায় মানব রচিত আইনে ডিগ্রি নিয়ে আল্লাহর আইন বাস্তবানের জন্য মিছিল, মিটিং, সেমিনার করলে কাজের কোঠায় শূণ্য আসবে।

আল্লাহ মানুষ পাঠিয়েছেন তার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য। আর সেই প্রতিনিধিত্বের জন্য ‘ফুরকান’ নামের আইন গ্রন্থও পাঠিয়েছেন। মানব রচিত আইন পড়ে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের জন্য রাস্তাঘাটে দৌড়াদৌড়ি করা তো সেই গাধার কাজ যে গাধা কৌতুক শোনার দুই মাস পর হাসতে শুরু করে। অথবা গাধামির র‌্যাংকিংয়ে সে আরো উপরে।

এই  সমস্ত আইন তো সেই বর্বরদের রচিত করছে। সেই বর্বরদের কাছে নিরপরাধদের অপরাধ হলো- তারা একত্ববাদে বিশ্বাসী, এক আল্লাহর জন্য মাথানত করে আর মুহাম্মাদ সা. তাদের প্রিয় নাবী-রাসূল, আদর্শ পুরুষ। এখন এই প্রশ্নটাই বিরাট বিস্ময় সৃষ্টি করছে যে, এই সমস্ত বর্বর, অসভ্যদের রচিত আইন একজন আল্লাহতে বিশ্বাসী মানুষ কিভাবে অধ্যয়ন করে, এবং যত্নসহকারে সেগুলোর প্রাকটিস করে। অনেকে বলেন, সময়ের মোকাবেলার জন্য। আচ্ছা, ধরলাম সময়ের মোকাবেলার জন্য অথবা কাটা দিয়ে কাটা তোলার জন্য। কিন্তু প্রক্রিয়াতো  ঠিক হতে হবে।

একজন রূপসী মেয়ে। পর্দানশীন। সে ঠিক করল পথহারা যুবকদেরকে পথ দেখাবে। এজন্য যা যা করা লাগে তার সবই করবে। নিজের দরজাকে সবসময় ওপেন রাখবে তাদের জন্য। অথবা কোন মানুষ পথহারাদেরকে দ্বীনি আলোচনা শুনানোর জন্য তাদেরকে মদের আসরে ইনভাইট করল। এবার বলুন- দাওয়াত দেওয়ার এই প্রক্রিয়া কি ঠিক? কক্ষনো না। একদম নাজায়েয।

সুতরাং কাজ করতে হবে ঐ প্রক্রিয়ায় যে প্রক্রিয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে সমর্থিত এবং জায়েজ সাব্যস্ত। সময়ের মোকাবেলা তো অনেকেই করেছেন। ইমাম গাজ্জালী,শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভী, তারা সবাই নিজের যুগের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু তারা অন্যেরটা গ্রহণ করেননি। বরং তাদের কি আছে সেটা জেনেছেন আর নিজেদেরগুলোকে বিকশিত করেছেন। ফলে সৃষ্টি হয়েছে “হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা” আর “ইহইয়ায়ে উলুমিদ্দ্বীন”।

আর বর্তমানে ইসলামী আইনের এক সম্মুখ যোদ্ধা আল্লামা তাক্বী ওসমানী। তিনিও একজন L.L.B ও L.L.M করা ছাত্র। কিন্তু তার পরিচয় হলো, তিনি শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ট আইনবিশারদ, মুফতি, শাইখুল ইসলাম।  তিনি সেই ‘ল’ পড়েছেন পড়ার জন্যই। কিন্তু জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো ব্যয় করেছেন ইসলামী আইনের পিছনে এবং এটাকে কেন্দ্র করেই তার বিশাল কীর্তি- ভান্ডার প্রকাশিত হয়েছে, হচ্ছে। আল-হামদুলিল্লাহ। তার জীবদ্দশায় তার জীবনীর উপর পি এইচ ডি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু কথা হলো- সেই মানব রচিত আইন পড়ে কয়জন তাক্বী উসমানী হতে পারবে?

যাই হোক, এমন আরো অনেক বিষয় আছে যার সাথে ইসলামী চেতনা বিশ্বাসের কোন মিল নেই। এখানে ‘আইন’ এর কথা এজন্যই তুললাম যে, আইন আর মানুষ, এদুটির মাঝে রক্ত-মাংসের সম্পর্ক। মানুষ থাকলে আইন থাকবে আর মানুষ না থাকলে আইনেরও কোন অস্তিত্ব থাকবেনা। হাইওয়ানরাতো কোন আইন মানে না। তাদের জন্য আইন তৈরিও হয়নি। বরং তাদের সাথে মানুষের আচরণটা কিরুপ হবে সেটাও মানুওষর জন্য একটা নির্ধারিত আইন। আইন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় মানুষের মানুষ্যতা ও বন্যতা। আল্লাহর আইনের প্রতি যে শ্রদ্ধাশীল, অনুগত সে মানুষ। আর যে অশ্রদ্ধাশীল , উদ্ধত সে আল্লাহর ভাষায়-  “কাল-আনয়াম বাল হুম আদ্বল”।

এইসমস্ত কথাগুলো বর্তমান সময়ের জন্য অথবা নিকট অতীতের জন্য। অতীতে হয়তো আরো অনেক কিছু ছিলো। ভবিষ্যতে এই অবস্থা চেইন্জ হবে, শান্তির প্রয়োজনে। অবশ্যই হবে। ইসলামী আইন তার পূর্ণ অবয়ব নিয়ে প্রস্ফুটিত হবে মানুষের জীবনে। নিকট অতীত আর বর্তমান তার আগাম জানান দিচ্ছে। ইসলামী ফিক্বহ তথা আইনশাস্ত্রকে যারা অস্বীকার করতে বসেছে তারা জমহুর উম্মাহর আক্বীদা-বিশ্বাসের বাহিরে বলে প্রমানিত হচ্ছে। তারা কুরআন আর হাদীসকেই শুধু ইসলামের উৎস বলে। আর “বাকী’ কিছু আছে বলে তারা বিশ্বাস করেনা।

এইসমস্ত কথাগুলো প্রসঙ্গক্রমেই বললাম-কারণ একজন মুমিনের জীবন আল্লাহর আইন ও রাসূলের আনুগত্যের এক ইঞ্চি সীমানার বাইরেও হবেনা। আরও করণ হলো- ইলাহি আইনে জীবন ধরে রাখার নামই যে চেতনা। উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানরা সময়ে সময়ে তার প্রমান প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা প্রমান করেছেন- আমার জীবনে সেই স্রষ্টার আইন বাস্তবায়ন করবো যেই স্রষ্টা “কুন- ফায়াকুনের অধিপতি, যিনি ঘোষণা দিয়েছেন- “খালাক্বাল ইন্সানা মিন আলাক্ব” এমনকি তারা সেই প্রভুর পথে নিজের জীবনের সমাপ্তি টেনেছেন। সেই পথে  আলো খুজেছেন, সে পথেই আলোকিত হয়েছেন।

সে রকম একটি দাস্তান শুনাই। বিশ্বাসী রক্তে যেই দাস্তান রচিত হয়েছিল পৃথিবীতে। পৌরদীপ্ত সূর্যময় এক যুবক আব্দুল কাদির খান। আজিমুশ্বান এক জলসায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে স্টেজে উঠেন। স্থানীয় অত্যাচারী রাজার বিরুদ্ধে নির্যাতিত মুসলিমদেরকে বিদ্রোহী হয়ে উঠার আহ্বান জানান। যিল্লতের জীবন ছেড়ে ইজ্জতের জীবনকে বেছে নেয়ার ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গে স্টেজ থেকেই গ্রেফতার হয়ে গেলেন। কিছুদিন পর, আদলতে তার মামলার শুনানি। প্রতিবাদ জানাতে শত শত মুসণিলম আদালতের বাহিরে একত্রিত হয়। সেদিনের সূর্যের তেজের চেয়েও যুবক মুসলিমদের তেজ ছিল বহু, বহুগুন বেশি।

জোহরের সালাতের সময় হলো। এক যুবক মুয়াজ্জিন হয়ে দাড়িয়ে গেলো। তার কণ্ঠের দৃঢ়তা আর ইসলামী বলিষ্ঠতা ছাপিয়ে বের হয়ে এলো….আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার…। মুহুর্তেই বুলেট বিদ্ধ হলো যুবক। শহীদ হয়ে গেলেন। তারপর আর এক যুবক তার স্থানে দাড়ালো আজান দিতে। এক শব্দ বলে সেও শহীদ হলেন। ইতিহাসের এই একমাত্র আজান যা নিজ ভূমিতে শত্রুর বলয়ে দেয়া হয়েছিল  এবং সেই আজান সম্পন্ন করতে ২২জন তরতাজা যুবক শহীদ হন। এই হলো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, রাসূলের প্রতি প্রেম, এবং বেলালের সুরে সুরে যুবকের জেগে উঠা। এই রক্তাক্ত সত্যতার সময়কাল হলো গত শতাব্দীর ১৯৩১ সাল, ১৩ই জুলাই, কাশ্মির।

এর থেকে পৃথিবী আরেকবার জেনে নিল মানুষের পৃথিবীতে মুসলিম মানে শির উন্নত, নির্ভীক, এক আল্লাহর দাস। তারা পূর্বসূরীর পথ ধরে নিজেদের জাতটাকে চিনিয়ে গেলেন। পরবর্তীদেরকে হাতে কলমে জানিয়ে গেলেন- আমরাই তোমাদের পূর্বসূরী। এখন বলি- আল্লাহর রাস্তায় এই জীবন বিলিয়ে দেওয়া কিসের প্রেরণায় ছিল? তাদের প্রেরণা ছিল- তাদের হৃদয়ে স্বসৌন্দর্যে জ্বলতে থাকা ঈমানী প্রদীপ। এমন প্রদীপ জ্বলে উঠুক সবার হৃদয়ে। জ্বলতে থাকুক জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত। ঈমানী চেতনায় বুদবুদ উঠুক নিঃশব্দে, বেঈমানদের জন্য।

চেতনার বারুদে বিস্ফোরণ  ঘটুক শুধু সত্যের জন্য, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য। বৃদ্ধ, কৃষ, কুঁজো, প্রতিবন্ধীর মতো না হয়ে, গাধার রচিত সভ্যতার চামচামা না করে মুসলিমেরা হয়ে উঠুক স্বকীয় চেতনার বাস্তবায়ণকারী। চেতনার নাম হোক পৌরুষ। রং হোক লাল, তার শ্রেষ্ঠত্ব গড়ে উঠুক শুধু আল্লাহর আইনের কাছে মাথা নত করে। দুনিয়ার কোন আইনের কাছে নয়।

লিখেছেন 

মুনীরা রহমান তাশফী 

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।