পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহা মানব আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ। চরিত্রের দিক দিয়ে যেমন রাসূল সাঃ এর সমাক্ষ কেউ ছিল না তেমনি দৈহিক গঠনের দিক দিয়েও নয়।

ফলে পৃথিবীর মহা মানব হিসেবে কেমন ছিল তাঁর দৈহিক সৌন্দর্য এবং গঠন এটা জানার আকাঙ্ক্ষা কম বেশি আমাদের সবার আছে।

দৈহিক সৌন্দর্য এবং কাঠামো

এক্ষেত্রে একটি কথা না বললেই নয়, আবু কারসানার মা এবং খালা আবু কারাসানার সাথে রাসূল (সা) এর কাছে বায়াতের জন্য আসেন। অতঃপর ফিরে যাওয়ার পথে তারা বললেন, “আমরা এমন সুদর্শন মানুষ আর দেখিনি। আমরা তাঁর মুখ থেকে আলো বিকীর্ণ হতে দেখেছি।” [১] 

ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করতে পারছেন। যদিও রাসূল সা. এর পবিত্র সৌন্দর্যের যথাযথ বর্ণনা করা অসম্ভব। তাইতো ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন,

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি স্বরূপে আমাদের মাঝে আবির্ভূত হতেন, তাহলে তাঁকে অবলোকন করা কারুর পক্ষেই সম্ভব হত না।[২]

কিন্তু তারপরেও আমি চেষ্টা করেছি বিভিন্ন উৎস থেকে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৈহিক গঠন ও সৌন্দর্য নিয়ে সামান্য কিছু লেখার।

উচ্চতা

হযরত আলী রা. ও হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. রাসূল সা. এর দেহাবয়বের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, রাসূল সা. অধিক লম্বাও ছিলেন না, আবার অতি বেটেও ছিলেন না। তবে মাঝারি গড়নের লোকদের মত ছিলেন।[৩]

রাসূল সা. ছিলেন মাঝারি গড়নের। এত বেঁটে ছিলেন না যে, গণনার বাইরে। আবার এত লম্বাও ছিলেন না যে, দৃষ্টি কটু। যেন দুটি ডালার মধ্যে তৃতীয় একটি ডালা, যা তিনটি ডালার মধ্যে সবচেয়ে বেশী চমৎকার ও দৃষ্টিনন্দন।[৪]

বর্ণ

বর্ণ বলতে মূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গায়ের রংকে বোঝানো হয়েছে। বর্ণের ব্যাপারে অনেক বর্ণনা এসেছে যেমন:

হযরত আবু তোফায়েল বলেন, তিনি ছিলেন গৌর রং-এর, চেহারা ছিলো মোলায়েম। তাঁর উচ্চতা ছিল মাঝারি ধরনের।[৫]

হযরত আনার রা. বলেন, তিনি আযহারুল লাউন তথা লালিমা মিশ্রিত শ্বেত বর্ণের অধিকারী ছিলেন।[৬]

হযরত আলী রা. বলেন, তিনি সুন্দর গোলাপি বর্ণের ছিলেন। [৭]

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, তিনি এত সুন্দর, নান্দনিক এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিলেন যেন তাঁর পবিত্র দেহখানা পূর্ণিমার চন্দ্র দ্বারা ধৌত করা হয়েছে। [৭]

মুখ ও মুখমণ্ডল মোবারক

হযরত বারা ইবনে আযেব রা. কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা কি তলোয়ারের মতো ছিল? তিনি বললেন, না বরং তাঁর চেহারা ছিল চাঁদের মতো। অপর এক বর্ণনায় রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা ছিল গোলাকার।[৮]

রবি বিনতে মোয়াওয়েয রা. বলেন, তোমরা যদি রাসূল সা.-কে দেখতে, তখন মনে হতো যে, যেন উদিত সূর্যকে দেখছ।।[৯]

জাবের ইবনে সামুরা রা: বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ প্রশস্ত ছিল।[১০]

দাঁত মোবারক

হযরত হিন্দ ইবনে আবি হালা (রাযি.) বলেন, তিনি মুফালি জুল আস্নান অর্থাৎ দন্ত মোবারক চিকন ছিল এবং এর মধ্যে সামনের দাঁতগুলোর মাঝে একটু ফাঁক ছিল। শুভ্রতার ব্যাপারে অন্যস্থানে বলেন, মুচকি হাসির সময় তাঁর দাঁত মোবারক শিলাখন্ডের ন্যায় সাদা চকচক করে উঠত।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন, তাঁর সম্মুখের দাঁতগুলি পৃথক পৃথক ছিল। অর্থাৎ মাঝে ফাঁক ছিল, ঘন ছিল না। যখন তিনি কথা বলতেন, তখন এই দাঁত মোবারক হতে যেন নূর ঠিকরে পড়ত।[১১]

চোখ, নাক ও গাল মোবারক

হযরত আলী রা বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখ কালো এবং লম্বা পলক ছিল।

নাক মোবারকের বর্ণনা দিতে গিয়ে হিন্দ ইবনে আবী হালা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলের নাক খানিকটা উঁচু , তার উপর জ্যোতির্ময় চমক। আর এ জন্য প্রথম দৃষ্টিতে বড় মনে হয়। গাল ছিল হালকা ও সমতল এবং নিচের দিকে একটু মাংসাল।[১০] 

ঘাড়, কাঁধ ও বুক মোবারক

তাঁর ঘাড় মোবারক অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল। হিন্দ ইবনে আবি হালা (রাযি.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহাবয়ব সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তাঁর ঘাড় মোবারক এত সুন্দর ও সূক্ষ্ম ছিল, যেমন কোন ভাস্কর্যের গর্দান।[৭]

হযরত আলী (রাযি.) হতে বর্ণিত আছে, প্রিয় নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়স্কন্ধের হাড়সমূহ বড়সড় ছিল।[১২]

পেট মোবারক

হিন্দ ইবনে আবি হালা (রাযি.) বর্ণনা করেন, তিনি পেট ও বক্ষের সমতল স্থুল দেহের অধিকারী ছিলেন। মেদভুড়ি সম্পন্ন ছিলেন না।[৭]

এমনিভাবে উম্মে মা‘বাদ খাযাঈয়া (রাযি.) যিনি তাঁর স্বামীর নিকট রাসূল সা. এর দৈহিক বিবরণ দিচ্ছিলেন, তিনি বলেন, তাঁর মধ্যে মেদভুড়ির ত্রুটি ছিল না, বরং তাঁর দেহ মোবারক সারা জাহানের সৌন্দর্যের দীপ্তি ছড়ানো এক অপূর্ব ছবি ছিল। অর্থাৎ কোন অপূর্ণতা ও ত্রুটি ছিল না যে, দেখতে অসুন্দর দেখাবে।

হস্ত মোবারক

হিন্দ ইবনে আবি হালা (রাযি.) বলেন, নবী কারীম সা. এর হস্তদ্বয় প্রশস্ত, গোশতে পরিপূর্ণ ও নরম ছিল। হিন্দ ইবনে আবি হালা (রাযি.) বলেন, প্রিয় নবী সা. এর আঙ্গুলসমূহ একই ধরনের লম্বা ছিল। অর্থাৎ অন্য লোকদের তুলনায় একটু লম্বা ধরনের ছিল।

হ্যাঁ, তবে সীমাতিরিক্ত লম্বা ছিল না যে, অসুন্দর দেখা যায় এবং আঙ্গুলের জোড়া শক্ত ও বড় ছিল।  হযরত আলী ও হিন্দ ইবনে আবি হালা (রাযি.) উভয়ের বর্ণনা যে, তাঁর জোড়ার হাড় মোটাসোটা ছিল।[৭]

দাড়ি ও গোঁফ

দাড়ি রাখা প্রত্যেক নবীর সুন্নাত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও দাড়ি রাখতেন। মূলত তাঁর দাঁড়ি এত ঘন ছিল যে, পবিত্র বক্ষ ঢেকে যেত।[১৩]

গোঁফের ব্যাপারে বলতে গেলে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোঁফ মোবারক কেটে খুব ছোট করে রাখতেন।

রাসূল সা. এর যুগে অগ্নিপূজকেরা গোঁফ লম্বা করে রাখত। আর দাড়ি খাটো করে রাখত। অথচ এটা ফিতরাত তথা নবীগণের অভ্যাস ও স্বভাব পরিপন্থী ছিল। এ জন্যই নবী সা. অগ্নিপূজকদের বিপরীত করার হুকুম দিলেন।

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পশম ও চুল মোবারক

মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে কম বেশী সবার পশম থাকে, তবে রাসূল সা. এর কেমন ছিল সেটা আমাদের জানার বিষয়। সেটা জানার আগে তাঁর মাথা মোবারকের চুল সম্পর্কে খানিকটা জেনে নেই।

হযরত কাতাদাহ রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুল মোবারক একেবারে সোজাও নয়, খুব বেশী কোঁকড়ানোও নয়।

হযরত বারা ইবনে আযেব রা: বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুল ঘন, কখনো কখনো কানের লতি পর্যন্ত লম্বা। কখনো ঘাড় পর্যন্ত।

হযরত আলী (রাযি.) বর্ণনা করেন, প্রিয় নবী সা. এর দেহ মোবারকে স্বাভাবিকতার অধিক পশম ছিল না।কোন কোন লোকের দেহে প্রচুর পশম হয়ে থাকে।

রাসূল সা. এর দেহ মোবারকের কোন কোন অংশে পশম ছিল। আবার কোন কোন অংশ একেবারে পশমশূন্য ছিল। পবিত্র দেহের যে সকল স্থানে পশম ছিল, বিভিন্ন বর্ণনামতে সে স্থানসমূহ হল

  • বাহুদ্বয়।
  • উভয় পায়ের নলী।
  • উভয় স্কন্ধ।
  • বক্ষের উপরাংশ।
  • কণ্ঠনালী হতে নাভি পর্যন্ত একটি সূক্ষ্ম রেখার মত ছিল।

প্রশস্ত বক্ষের অধিকারী ছিলেন এবং তাঁর বক্ষের উপরি অংশে পশমও ছিল। তবে উভয় স্তন পশম শূন্য ছিল।[৭]

পা মোবারক

হিন্দ ইবনে আবি হালা (রাযি.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) এর পায়ের তলা খানিকটা গর্ত ছিল।[৭]

প্রিয় নবী (সা) এর দেহাবয়বের বর্ণনায় আছে তাঁর পায়ের তলা খালি ছিল।[১২]

রাসূল (সা) এর পায়ের আঙ্গুলসমূহ সমানভাবে অন্যদের তুলনায় একটু লম্বা ছিল। যেমনটা আঙ্গুলের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরো পড়ুন

কেমন ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেশভূষা ও সাজ-সজ্জা

কেমন ছিল মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা: এর ইন্তেকালের দিন

শেষ কথা

রাসূল সা: সম্পর্কে বহু সংখ্যক সাহাবী অনেক চমকপ্রদ বিবরণ প্রদান দিয়েছেন, যার সবকিছু এই লেখায় তুলে ধরা সম্ভব হয় নি। চেষ্টা করা হয়েছে রাসূল সাঃ এর দেহ কাঠামো ও সৌন্দর্য সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়ার। লেখাটি পড়ার পর আপনার অনুভূতি কেমন হয়েছে আশা করি সেটা জানাতে ভুলবেন না। 

সূত্র:

১.আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া ১/২৫৫
২.খাসায়েলে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – মুফতি সুলাইমান কাসেমী সাহারানপুরী
৩.বোখারী শরীফ: ১/৫০২
৪. যাদুল মা’আদ:৫৪
৫.সহীহ মুসলিম: ২/২৫৮
৬.বোখারী শরীফ: ১/৫০২
৭.শামায়েলে তিরমিযী
৮.সহীহ বোখারী : ১/৫০২, সহীহ মুসলিম ২/২৫৯
৯.মোসনাদে দারেমী, মেশকাত ২/৫১৭
১০. সিরাতে মুহাম্মদে আরবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-মাওলানা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ সাহেব কাসেমী
১১.মেশকাত শরীফ ২য় খন্ড, ৫৭১ পৃষ্ঠা
১২.আর-রাহীকুল মাখতুম ৭৫২ পৃষ্ঠা
১৩.উসওয়ায়ে রাসূল, শা. তি.

 

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।