ছোট একটি গ্রাম আদর্শ নগর। পুরো গ্রামটিই সবুজ শ্যামল। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া রাস্তার পাশের গাছ গাছালির মুক্ত হাওয়া, সুবহে সাদিকের সময় মসজিদের মিনারে মিনারে মুয়াজ্জিনের কন্ঠে আজানের মধুর ধ্বনি, সকালে পাখ-পাখালির কন্ঠে কিচিরমিচির আওয়াজ আর কোঁকিলের কন্ঠে কুহু কুহু তান।

মানব হৃদয়কে মুগ্ধ করে সূর্যের কিরণ বি”ছুরিত হতে না হতেই কৃষক লাঙ্গল নিয়ে নামে মানব কল্যাণে জমির বুকে। গ্রামের মধ্যে নেই কোন ঝগড়া-ঝাটি, হিংসা-বিদ্বেষ, সকলে যেন আপন মায়েরি সন্তান, ভাই ভাই।

সকাল ৮টা বাজলেই বাড়ি থেকে বের হয় পিঁপিলিকার মত, মাদরাসা, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা, এ এক মনোরম দৃশ্য। ও, বলতে ভুলেই গেছি যে, ফজর নামাজ বাদ শুরু হয় পবিত্র কালামে পাকের তেলাওয়াত। শিশুদের কন্ঠে তেলাওয়াত শুনে মনে হয় যেন লওহে মাহফুজ থেকে ওহি নাযিল হচ্ছে। মোটকথা, পুরো গ্রামের প্রত্যেকটি দিকই এ দেশ বাসীর জন্য আদর্শ।

এ গ্রামের এক গরিব পরিবারের সন্তান নাসিম। ছয় ভাই বোনের মধ্যে সে ৪র্থ। ভাই বোন সকলেই মেধাবি। নাসিম তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তার পিতা ইন্তেকাল করেন। তার মাতা ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে, দ্বীনদারী, ধৈর্যশীলা। মায়ের দৃঢ় সিদ্ধান্তে সকল সন্তান লেখা পড়া চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

নাসিম ক্লাসের মেধাবিদের প্রথম কাতারে ছিল। তার ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা চার পিরিয়ড পর বিরতী হলে আইসক্রিম, ঝালমুড়ি, আচার, চানাচুর আরও বিভিন্ন ধরনের খাবার খেত। ওর বন্ধুরা ওকে বলত নাসিম তোমার টাকা নেই, তুমি যে কিছু খাওনা? নাসিম উত্তরে বলত বাসায় গিয়ে ভাত খাব।

আর বিরতির সময় আমাকে যোহরের নামায আদায় করতে হবে, মা আমাকে বিরতির সময় বন্ধুদের সাথে আড্ডা না দিয়ে নামায আদায় করতে বলেছেন। প্রত্যেক সন্তানকে সাত বছর থেকে নামায আদায় করা উচিত এটা নাকি নবী (স.) এর নির্দেশ।

নাসিমের অন্য বন্ধুরা প্রতিদিন ক্লাসে যাওয়ার আগে বিভিন্ন বাহানা ধরে টাকা নিত, কিন্তু নাসিম এর বিপরীত, ও কোনো বাহানাতো ধরতইনা বরং মায়ের গালে দুটু চুমু দিয়ে হাঁসি মুখে চলে যেত।

নাসিম প্রতিদিন ওদের বাড়ির পাশের পুকুরপাড় দিয়ে স্কুলে যেত। ঐ পুকুরপাড় দিয়ে প্রতিদিন অনেক ব্যবসায়ি টাকা নিয়ে মালা-মাল বা কাপড় কিনতে যেত। একদিন এক ব্যবসায়ি এক লাখের মত টাকার বান্ডিল পলিথিনে পেঁচিয়ে হাটে কাপড় কেনার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। ঘটনাক্রমে তার অজান্তে এ টাকা পুকুর পাড়ে পড়ে যায়।

প্রতিদিনের নিয়মানুযায়ি নাসিম এ পুকুরপাড় দিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল, এমন সময় তার চোখের সামনে পরে এ টাকার পুটলিটি। সে হাত দিয়ে পলিথিন খুলে দেখল একশ, পাঁচশ, হাজার টাকার নোট এত টাকা সে কখনো দেখেনি, তবে সে তার গণিত বইয়ে এই ধরনের নোটের ছবি দেখেছে। নাসিম বান্ডিল থেকে ইচ্ছে করলে কিছু টাকা নিয়ে তা দিয়ে আজ হয়ত বন্ধুদের সাথে মালাই, ঝালমুড়ি, চানাচুর, চকলেট খেতে পারতো।

এতদিন তো টাকার অভাবে বিরতির সময় কিছু কিনে খেতে পারে নি, আজ তো সে পারতো, কিন্তু নাসিম গরিব হলে কি হবে, সেতো আদর্শ মায়ের সন্তান, ইসলাম শিক্ষা বইয়ে পড়েছে অনুমতি ছাড়া পরের কোনও কিছুু ব্যবহার করা ঠিক নয়। আর মা শিক্ষা দিয়েছিলেন পথে পড়ে থাকা কোনও কিছুু ধরবে না, আর ধরলেও মুরব্বিদের হাতে তুলে দিবে।

মায়ের শিক্ষানুযায়ী নাসিম টাকা পথে ফেলে না রেখে কিছু একটা বুঝে নিজ হাতে তুলে নিয়ে তার পরিচিত এক বৃদ্ধ দাদার কাছে দিল। ছেলেটি মেধাবী, হয়ত বুঝতে পেরেছিল ফেলে রাখলে প্রকৃত মালিক টাকাটা পাবে না। বৃদ্ধ দাদার নাম ছিল আ. রহিম। সে তো টাকার পুটলি দেখে অবাক, এমন ছেলেও কি গ্রামে আছে! এ বয়সের ছেলেরা টাকা পেলে আবার ফেরত দেয়! এ কি দেখছি? এতো বিশ্বাস করতে পারছি না।

বৃদ্ধ দাদা অঝোর নয়নে কেঁদে নাসিমের জন্যে দোয়া করলেন। সেই সাথে সাথে এলাকায় জানিয়ে দিলেন, পুকুর পাড়ে কিছু টাকা পাওয়া গেছে যার হয় সঠিক প্রমাণ দিয়ে নিয়ে যাবে। এ দিকে কাপড় ব্যবসায়ী যখন কাপড়ের মূল্য পরিশোধ করার জন্য ব্যাগের মধ্যে হাত দিল, টাকা না পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। নিরুপায় হয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। মনে মনে ভাবে আমার ভিক্ষা ছাড়া উপায় নেই।

বাড়িতে এসে টাকা পাওয়ার ঘোষণা জানতে পেরে ঐ বৃদ্ধ দাদা আ. রহিমের কাছে টাকার প্রমাণ দিয়ে টাকা উদ্ধার করে। সাথে সাথে ঘটনা জানতে চায়, ঘটনা শুনে নাসিমকে ঐ ব্যবসায়ী দেখতে চায়। নাসিমকে দেখে ব্যবসায়ী ওর মাথায় হাত দিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করে এবং ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকে নাসিম, এ গ্রামের শত শিশু কিশোরের আদর্শ তুমি।

তোমার মত সততাবান হোক প্রতিটি সন্তান, তুমি হও এ জাতির আদর্শের রুপকার, তোমার মায়ের কোল ভরে যাক তোমার সোনালী সফলতা দ্বারা। সাথে সাথে ওখান থেকে নতুন কয়েকটা টাকার নোট তুলে দেয় ওর লেখা পড়ার জন্য। টাকা পেয়ে গভীর রাতে ব্যবসায়ী নজরুল তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে হাত তুলে মহান আল্লাহর কাছে বলে, আল্লাহ! তুমি নাসিমকে যুগের শ্রেষ্ট আদর্শ ছেলে হিসেবে কবুল কর, আর এ গ্রামের প্রত্যেকটি সন্তানকে ওর মত আদর্শবান করে দাও।

প্রিয় বন্ধুরা! আমরা যেন নাসিমের আদর্শে আদর্শবান হতে পারি, আল্লাহ আমাদের সে তাওফিক দান কর, আমীন।
লিখেছেনঃ
মো: নাকিব

দ্বীনি কথা শেয়ার করে আপনিও ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করুন।